চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ – আবুল হাসান

চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ – কবিতাটি কবি “আবুল হাসান” এর লিখা।

 

চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ - আবুল হাসান

 

আবুল হাসান (জন্ম: ৪ আগস্ট ১৯৪৭ – ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫) বাংলাদেশের একজন আধুনিক কবি যিনি ষাটের দশকের সঙ্গে চিহ্নিত। পেশায় তিনি সাংবাদিক ছিলেন। তার প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া আর সাহিত্যিক নাম আবুল হাসান। তিনি ষাটের দশকের জনপ্রিয় কবিদের একজন এবং সত্তুরের দশকেও গীতল কবিতার জন্য উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা লাভ করেন। আবুল হাসান ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে এস.এস.সি পাশ করেন। তারপর বরিশালের বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।

পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বি.এ শ্রেণিতে ভর্তি হন, কিন্তু পরীক্ষা শেষ না করেই ১৯৬৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তাবিভাগে যোগদান করেন। পরে তিনি গণবাংলা (১৯৭২-১৯৭৩) এবং দৈনিক জনপদ-এ (১৯৭৩-৭৪) সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আবুল হাসান অল্প বয়সেই একজন সৃজনশীল কবি হিসাবে খ্যাতিলাভ করেন। মাত্র এক দশকের কাব্যসাধনায় তিনি আধুনিক বাংলার ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। আত্মত্যাগ, দুঃখবোধ, মৃত্যুচেতনা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিঃসঙ্গচেতনা, স্মৃতিমুগ্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবুল হাসানের কবিতায় সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম হন।

 

চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ – আবুল হাসান

 

আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ
নইলে সরকারী লোক, পুলিশ বিভাগে চাকরী কোরেও
পুলিশী মেজাজ কেন ছিলনা ওনার বলুন চলায় ও বলায়?
চেয়ার থেকে ঘরোয়া ধূলো, হারিকেনের চিমনীগুলো মুছে ফেলার মতোন তিনি
আস্তে কেন চাকর বাকর এই আমাদের প্রভু নফর সম্পর্কটা সরিয়ে দিতেন?
থানার যত পেশাধারী, পুলিশ সেপাই অধীনস্থ কনেস্টবল
সবার তিনি একবয়সী এমনভাবে তাস দাবাতেন সারা বিকাল।

মায়ের সঙ্গে ব্যবহারটা ছিল যেমন ব্যর্থ প্রেমিক
কৃপা ভিক্ষা নিতে এসেছে নারীর কাছে!

আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ
নইলে দেশে যখন তাঁর ভাইয়েরা জমিজমার হিশেব কষছে লাভ অলাভের
ব্যক্তিগত স্বার্থ সবার আদায় কোরে নিচ্ছে সবাই
বাবা তখন উপার্জিত সবুজ ছিপের সুতো পেঁচিয় মাকে বোলছেন এ্যাই দ্যাখোতো
জলের রং-এর সাথে এবার সুতোটা খাপ খাবে না?

কোথায় কাদের ঐতিহাসিক পুকুর বাড়ি, পুরনো সিঁড়ি
অনেক মাইল হেঁটে যেতেন মাছ ধরতে!

আমি যখন মায়ের মুখে লজ্জাব্রীড়া, ঘুমের ক্রীড়া
ইত্যাদি মিশেছিলুম, বাবা তখন কাব্যি কোরতে কম করেননি মাকে নিয়ে
শুনেছি শাদা চামেলী নাকি চাপা এনে পরিয়ে দিতেন রাত্রিবেলায় মায়ের খোপায়!

মা বোলতেন বাবাকে তুমি এই সমস্ত লোক দ্যাখোনা?
ঘুষ খাচ্ছে, জমি কিনছে, শনৈঃ শনৈঃ উপরে উঠছে,
কতরকম ফন্দি আটছে কত রকম সুখে থাকছে,
তুমি এসব লোক দ্যাখোনা?

বাবা তখন হাতের বোনা চাঁদর গায়ে বেরিয়ে কোথায়
কবি গানের আসরে যেতেন মাঝরাত্তিরে
লোকের ভীড়ে সামান্য লোক, শিশিরগুলি চোখে মাখতেন!

এখন তিনি পরাজিত, কেউ দ্যাখেনা একলা মানুষ
চিলেকোঠার মতোন তিনি আকাশ দ্যাখেন, বাতাস দ্যাখেন
জীর্ণ ব্যর্থ চিবুক বিষণ্ন লাল রক্তে ভাবুক রোদন আসে,
হঠাৎ বাবা কিসের ত্রাসে দুচোখ ভাসান তিনিই জানেন!

একটি ছেলে ঘুরে বেড়ায় কবির মতো কুখ্যাত সব পাড়ায় পাড়ায়
আর ছেলেরা সবাই যে যার স্বার্থ নিয়ে সরে দাঁড়ায়
বাবা একলা শিরঃদাঁড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন, কী যে ভাবেন,
প্রায়ই তিনি রাত্রি জাগেন, বসে থাকেন চেয়ার নিয়ে

চামেলী হাতে ব্যর্থ মানুষ, নিম্নমানের মানুষ!

 

আবুল হাসান চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ - আবুল হাসান

 

চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ কবিতা আবৃত্তি ঃ

 

 

আরও দেখুনঃ

 

Competitive Exams Preparation Gurukul, GOLN Logo [ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি গুরুকুল, লোগো ]

মন্তব্য করুন