জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change । প্রতিবেদন রচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর

জলবায়ু পরিবর্তন রচনাঃ জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে উপনীত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সর্বপ্রথমে আসে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। এর ফলে আবহাওয়া পরিবর্তিত হচ্ছে, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং সারা বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমাগত বেড়ে চলছে। ব্যাপক হারে জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার, বনাঞ্চল ধ্বংস, শিল্পায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির দরুণ উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, যা সৃষ্টি করছে নতুন হুমকি।

জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change
জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change

জলবায়ু পরিবর্তন রচনা

ভূমিকা :

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ থেকেই মানুষ আস্তে আস্তে গড়ে তুলেছে তার পরিবেশ । একবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে মানবজাতি যখন সভ্যতার চরম শিখরে , ঠিক তখনই পরিবেশ আমাদের ঠেলে দিচ্ছে মহা বিপর্যয়ের দিকে । বর্তমান বিশ্বে জলবায়ুর পরিবর্তন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সরকারই স্বীকার করেছে , জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক উষ্ণতা মানবজাতি এবং প্রকৃতির জন্য হুমকি । শুধু ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ( IGPC ) ‘ র গবেষণা নয় , বরং বহু আগে থেকে বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনগুলো উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবের কথা বলে আসছে ।

ফলে পৃথিবী এক ভয়াবহ সংকটময় অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । সারা বিশ্বে পরিবেশবাদী মানুষ ও সংগঠন জলবায়ুর পরিবর্তনের বিষয়ে একটি বৈশ্বিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে । সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের বিশেষ করে বাংলাদেশ , মালদ্বীপ , নেপাল ও আফ্রিকার দেশসমূহের মানুষ ও পরিবেশবাদী সংগঠন তাদের রাজনৈতিক নেতাদের কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য চাপ দিয়ে আসছে ।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গৃহীত না হলে বাংলাদেশসহ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কম উচ্চতাসম্পন্ন দেশসমূহ একদিন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে যাবে ।

জলবায়ু :

কোনো স্থানের কোনো বিশেষ সময়ের বায়ুর তাপমাত্রা , বায়ুপ্রবাহ , বৃষ্টিপাত , বায়ুচাপের মিলিত অবস্থাকে সে স্থানের সে সময়ের আবহাওয়া বলা হয় । আবহাওয়ার সতত পরিবর্তন ঘটে । কেননা বায়ুর উষ্ণতা, চাপ , বৃষ্টিপাত , আর্দ্রতা সবসময় একরূপ থাকে না । আর পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে কোনো খানের বায়ুর তাপ , চাপ , বৃষ্টিপাত , বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদির ২৫ বা ৩০ বছরের গড় অবস্থাকে সে স্থানের জলবায়ু বলে ।

জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change
জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change

জলবায়ুর পরিবর্তন :

জলবায়ুর চিরাচরিত অবস্থায় ও আচরণে লক্ষণীয় অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়াকে বলা হয় জলবায়ু পরিবর্তন। গত শতাব্দীর শেষপ্রান্তে এসে বিশ্বের পরিবেশবিদগণ লক্ষ করেন যে , সারা বিশ্বের জলবায়ুর ক্ষেত্রে বহু ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে । এ পরিবর্তনের অন্যতম দিক হচ্ছে , বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা আবাহাওয়া মণ্ডলের উত্তাপ বৃদ্ধি , ঋতুচক্রের শৃঙ্খল ভেঙে যাওয়া বা ঋতুবৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন , অতিবৃষ্টি , অনাবৃষ্টি , অকালবন্যা , সামুদ্রিক ঝড় , দাবানল , সর্বোপরি সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি প্রভৃতির প্রাকৃতিক অবক্ষয় ।

জলবায়ু বিবর্তন বা পরিবর্তনের প্রমাণ :

সৃষ্টির ঊষালগ্ন হতে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হচ্ছে তা বিভিন্নভাবে প্রমাণিত হয় । পাললিক শিলার প্রকৃতি হতে পৃথিবীর অতীত কালের জলবায়ু সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা সম্ভব । হিমবাহ দ্বারা সজ্জিত শিলাচূর্ণ হতে অতীতে হিমবাহ সংশ্লিষ্ট জলবায়ুর আভাস পাওয়া যায় । সাধারণত জিপসাম ও লবণ খনির অস্তিত্ব অতীতের শুষ্ক জলবায়ুর অবস্থান উল্লেখ করে ।

তবে চুনাপাথরের অস্তিত্ব হতে উষ্ণ জলবায়ুর প্রমাণ মেলে । অতীতকালের স্বাভাবিক জলবায়ু ছিল মৃদুভাবাপন্ন । সিলুরিয়ান , নিম্ন কার্বনিফেরাস , জুরাসিক , ইয়োসিন প্রভৃতি ভূতাত্বিক যুগে পৃথিবীর জলবায়ু স্বাভাবিক ছিল । বর্তমানকালের তাপ বলয়গুলো সুদূর অতীতে মেরু অঞ্চলের দিকে অধিক সস্থান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ :

মানুষ নিজেই স্বপ্নময় পৃথিবীকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে । পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে , জলবায়ুর অস্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির পেছনে মানুষের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে । আইয়াপেটাসের পুত্র টাইটান প্রমিথিউস অ্যাপোলোর অগ্নিরথ থেকে আগুন নিয়ে মানুষকে আগুনের ব্যবহার শিখিয়েছেন ।

অক্সিজেন ( O ) ) এই আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে । পৃথিবীতে যত আগুনের ব্যবহার হবে ততই অক্সিজেন কমতে থাকবে । বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পরিমান ২০.৭১ ভাগ , কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে । এর বিরূপ প্রভাব পৃথিবীর জলবায়ুর উপর পড়ছে ।

পৃথিবীকে বেষ্টনকারী আবহাওয়ামণ্ডলে ‘ ওজোন স্তর ‘ নামে অদৃশ্য এক বেষ্টনী বিদ্যমান , যা পৃথিবীতে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি প্রবেশ রোধ করে এবং বিকিরণ প্রক্রিয়ায় পৃথিবী থেকে আসা তাপ মহাশূন্যে পুনরায় ফিরে যেতে সহায়তা করে ।

কিন্তু মানবসৃষ্ট দূষণ ও গৃহস্থালি পণ্য যেমন – ফ্রিজ , এয়ারকন্ডিশনার , বিভিন্ন ধরনের স্প্রে ইত্যাদিতে ব্যবহৃত সিএফসি ( ক্লোরোফ্লোরো কার্বন ) গ্যাস , শিল্প বর্জ্য , কল – কারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া থেকে নির্গত কার্বন ডাই – অক্সাইড , নাইট্রাস অক্সাইড , মিথেন গ্যাস দ্বারা প্রকৃতি প্রদত্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী , ওজোনস্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ।

একদিকে পরিবেশ দূষণ এবং অন্যদিকে বনভূমি উজার করার ফলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই – অক্সাইড শোষিত হচ্ছে না । আর এসব কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে এবং ওজোনস্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে , উতপ্ত হচ্ছে পৃথিবী । বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ।

জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change
জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি :

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য পরিণতি হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি । বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে ভূ – পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় । এই বর্ধিত তাপমাত্রার ফলে হিমালয় পর্যন্ত , উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর গ্রিণল্যান্ড , অ্যান্টার্কটিকাসহ অন্যান্য ভূ – ভাগের সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে । বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব – দ্বীপ , যেখানে অসংখ্য নদনদী বয়ে চলেছে ।

পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ ° সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের ১১ শতাংশ ভূমি সমুদ্র গর্বে বিলীন হয়ে যাবে । এর ফলে ৫৫ মিলিয়ন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে । বাংলাদেশে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর ৭ মি.মি. হারে বাড়ছে , যেখানে ভূ – পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার ৫-৬ মি.মি. / বছর ।

যার ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার ১-২ মি.মি. / বছর । Intergovernment Panel of Climate Change ( IPCC ) – এর এক সমীক্ষায় বলা হয় , বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি দশকে ৩.৫ থেকে ১৫ মি.মি. বৃদ্ধি পেতে পারে । এমনকি ২১০০ সাল নাগাদ তা ৩০ সে.মি. এ পৌঁছাতে পারে ।

জীববৈচিত্র ধ্বংস :

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে । উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বনজঙ্গল ধ্বংসের ফলে বিভিন্ন প্রজাতি আজ বিলুপ্তির পথে । কারণ প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে তারা খাপ খাওয়াতে পারছে না । বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীবজন্তুর আসাবভূমি সুন্দরবন । পরিবেশ ও ভূমি – বিজ্ঞানীদের মতে , সমুদ্রের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পেলে সুন্দরবনের প্রায় ৭০ ভাগ তলিয়ে যাবে । যার ফলে বনজ পরিবেশ পড়বে চরম বিপর্যয়ে।

সুপেয় পানির সংকট :

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে । আইলা দুর্গত মানুষকে এখনো পানির সন্ধানে পার্শ্ববর্তী এলাকায় যেতে হচ্ছে । সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উপকূলের প্রায় সব এলাকার নদী – খালবিল – পুকুর – জলাশয়ে পানির প্রবাহ সৃষ্টি করেছে । ফলে সেখানে মিঠা পানির প্রকট অভাব দেখা দিয়েছে ।

অতিবৃষ্টি , অনাবৃষ্টি ও দাবানল :

জলবায়ুর পরিবর্তনে একদিকে যেমন অতিবৃষ্টি হচ্ছে অন্যদিকে তেমনি অনাবৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রকোপ লক্ষ করা যাচ্ছে । এতে ইতোমধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে । আর অস্বাভাবিকভাবে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বনাঞ্চলে আকস্মিক আগুন লেগে যাচ্ছে । যুক্তরাষ্ট্র , অস্ট্রেলিয়া , কানাডা , জাপান , প্রভৃতি দেশে দাবানল জনগণের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে ।

নদনদীর প্রবাহ হ্রাস ও নদীভাঙন :

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ । কৃষির জন্য প্রয়োজন মৃদু পানির । উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে নদনদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হবে । জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশে অন্যতম একটি সমস্যা দেখা দেবে সেটি হলো নদীভাঙন । অতিরিক্ত নদীভাঙনের ফলে মেঘনা ও পদ্মার তীরবর্তী এলাকাসমূহের বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী সর্বষাপ্ত হয়ে পড়ছে ।

IPCC- এর এক সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে , প্রতি দুই সেন্টিমিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে উপকূলীয় তটরেখা গড়ে ২-৩ মিটার স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হবে । ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ মূল ভূ – পৃষ্ঠের ৮০-১২০ মিটার পর্যন্ত অতিক্রম করবে ।

সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস :

পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রাও ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে । এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতাও বেড়ে যাবে । সাম্প্রতিক সময়ের ‘ সিডর ‘ ও ‘ আইলা ‘ তারই ফলাফল । পরিবেশ দূষণের কারনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ।

মানুষের সৃষ্ট দূষণের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তনের ধারা সৃষ্টি হয়েছে , তা বাংলাদেশের জন্য খুবই মারাত্মক । অবশ্য এর দায়ভার সবচেয়ে বেশি ধনী দেশগুলোর । অনেক ধনী রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত ‘ কিয়োটো প্রটোকল , ১৯৯৭ ‘ কার্যকর করে নি ।

বন্যা :

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘনঘন বন্যা সংঘটিত হয় । মৌসুমি বন্যা , জোয়ারভাটাজনিত , অতিবৃষ্টি জনিত বন্যার পাশাপাশি আকস্মিক বন্যা পৃথিবীর জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে তৃতীয় বিশ্বের প্রায়ই অধিকাংশ দেশই এর শিকার হচ্ছে ।

বালাদেশের জলবায়ু :

বাংলাদেশের অবস্থান নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলে । গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪ ° সেলসিয়াস এবং সর্বনিম ২১ ° সেলসিয়াস । শীতকালে সর্বোচ্চ ২৯ ° সেলসিয়াস সর্বনিম্ন ১১ ° সেলসিয়াস বর্ষাকালের গড় তাপমাত্রা ২৭ ° সেলসিয়াস থাকে। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২৬.০১ ° সেলসিয়াস এবং গড় বৃষ্টিপাত ২০৩ সেন্টিমিটার । শীত , গ্রীষ্ম ও বর্ষা – এ তিনটি ঋতু এদেশে চরমভাবাপন্ন ।

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব :

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে । ২০০৭ সালে জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেলের ( আইপিসিসি ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল , ২০৫০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা এক মিটার বাড়বে ।

ফলে বাংলাদেশের উপকূলের ১৭ শতাংশ পানি নীচে তলিয়ে যাবে । এর ফলে প্রায় ৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে । খরা , বন্যা , অতিবৃষ্টি , নদীভাঙ্গন , সামুদ্রিক ঝড় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে ।

সিডর আইলা , নার্গিসের ক্ষতচিহ্ন এখনও শুকায় নি । ২০০৯ সালের ২৩ জুন দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় । ২০০৯ সালের ২৮ জুন মাত্র ৬ ঘণ্টায় দেশে ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় ।

উত্তরবঙ্গে এদেশে সময়মতো বৃষ্টিপাত হচ্ছে না । সময়মতো শীত আসছে না আবার প্রায় সারা বছরই গ্রীষ্মের দাবদাহ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের তেমন হাত না থাকলেও বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । জলবায়ু পরিবর্তনে যে সিএফসি গ্যাস দায়ী তার শতকরা ৮৫ ভাগই উৎপন্ন করে উন্নত দেশগুলো ।

বাংলাদেশ বিশ্বের বার্ষিক উৎপন্ন সিএফসি গ্যাসের মাত্র ০.০২ শতাংশ উৎপাদন করে । তবে ২১ এপ্রিল ২০১০ তারিখে সিইজিআইএস কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের এত শঙ্কিত হবার কোনো কারণ নেই । তবে জলবায়ুর পরিবর্তন রোধে এখনই সময় বিশ্বকে এক হওয়া নয়ত , অদূর ভবিষ্যতে মালদ্বীপের মতো দেশগুলো পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে ।

জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change
জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change

জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন ও বাংলাদেশ :

কোপেনহেগেনে ৭ ডিসেম্বর ২০০৯ শুরু হওয়া জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনে ১৯৩ দেশ অংশগ্রহণ করে । ১৯ ডিসেম্বর একটি অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষরের মাধ্যমে সম্মেলন শেষ হয় । এতে উন্নত দেশ অঙ্গীকার করে যে , তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ৩০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিবে ।

পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য । দরিদ্র দেশগুলোকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল । বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হওয়ায় ১৫ শতাংশ সাহায্যের আশা করছে ।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্য :

বাংলাদেশ সরকারের প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয়ক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসের ( সিইজিআইএস ) বলেছে , হিমালয় পর্বতমালা থেকে প্রতিবছর ১০০ কোটি টন পলি বঙ্গোপসাগরে এসে পড়ে ।

সমুদ্রের জোয়ার – ভাটার টানে তা বাংলাদেশের উপকূলে এসে জড়ো হয়ে নতুন ভূমি গঠন করে । এভাবে গত ৬৫ বছরের বাংলাদেশের উপকূলে এক হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি জেগে উঠেছে । ফলে সমুদ্রের পানি বেড়ে গেলেও উপকূলীয় এলাকায় পলি পড়ার ফলে ভূমির স্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব এলাকা সমুদ্রে বিলীন হবে না ।

উপসংহার :

পৃথিবীকে বসবাস যোগ্য করে রাখার দায়িত্ব মানুষের । অথচ মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দ্বারা পৃথিবীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে । কেননা মানুষ একদিকে সভ্যতার চরম শিখরে আরোহন করছে আর অন্যদিকে পৃথিবীকে ঠেলে দিচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে । তাই মানুষকে যার যার নিজের অবস্থান থেকে পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে সচেতন ও কৌশলগতভাবে অবস্থানের মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে ।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তরঃ

 প্রশ্ন : মরা লেক ‘এরি’ কোথায় অবস্থিত?
উত্তর : যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যে।

 প্রশ্ন : মৃত সাগর কোথায় অবস্থিত?
উত্তর : জর্ডানে।

 প্রশ্ন : ভিয়েতনাম ওয়াল কোথায় অবস্থিত?
উত্তর : ওয়াশিংটন ডিসিতে।

 প্রশ্ন : জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রে কবে বিস্ফোরণ হয়?
উত্তর : ১১ মার্চ ২০১১।

প্রশ্ন : গত ১০০ বছরে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কত ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে?
উত্তর : ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস/০.৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

 প্রশ্ন : পানিকে কত মিনিট ফোটালে জীবাণুমুক্ত হয়?
উত্তর : ১৫-২০ মিনিট।

 প্রশ্ন : সমুদ্রের উচ্চতা ২ মিটার বাড়লে বাংলাদেশের কত অংশ পানির নিচে চলে যাবে?
উত্তর : প্রায় এক দশমাংশ।

 প্রশ্ন : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে কতভাগ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে?
উত্তর : ৩০%।

 প্রশ্ন : বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা হয় কত সালে?
উত্তর : ১৯৭৮-১৯৭৯।

 প্রশ্ন : বাংলাদেশে প্রলয়ংকরী বন্যা হয় কবে?
উত্তর : ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৫, ২০০৪, ২০০৭।

প্রশ্ন : ১৯৫০ সালের পর থেকে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শতকরা প্রায় কতভাগ বনভূমি ধ্বংস হয়?
উত্তর : ৮০%।

 প্রশ্ন : জলবায়ুজনিত কারণে ২১০০ সালের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাবে কত শতাংশ?
উত্তর : ৩০%।

 প্রশ্ন : জলবায়ুজনিত কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলায় কত অংশ কৃষিজমি লবণাক্ততার শিকার?
উত্তর : ১৩%।

 প্রশ্ন : সমুদ্রের পানির উচ্চতা যদি ৪৫ সেন্টিমিটার বাড়ে, তাহলে সুন্দরবনের কত অংশ তলিয়ে যাবে?
উত্তর : ৭৫%।

 প্রশ্ন : পানির তাপমাত্রা কত ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাছ ও মাছের পোনা মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে?
উত্তর : ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে।

আরও পড়ুনঃ

“জলবায়ু পরিবর্তন রচনা । Essay on Climate change । প্রতিবেদন রচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন