ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber । প্রতিবেদন রচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর

ডেঙ্গু জ্বর রচনাঃ ডেঙ্গু’ একটি স্প্যানিশ শব্দ। এর অর্থ হাড়ভাঙা জ্বর। এ জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গ ভাইরাস থেকে। ডেঙ্গমূলত মশাবাহিত একসূত্ৰক আরএনএ ভাইরাস। কয়েক প্রজাতির স্ত্রী এডিস মশা এই ভাইরাস বহন করে।সেগুলাের মধ্যে এডিস ইজিপ্টাই অন্যতম। তবে এই মশা শুধু ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাসই নয়, ইয়েলাে ফিভার ভাইরাস, জিকাভাইরাস এবং চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক।

ডেঙ্গু জ্বর রচনা

ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber
ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber

ভূমিকা :

ডেঙ্গু জ্বর বর্তমানে বহুল আলােচিত বিষয়গুলাের অন্যতম। বাংলাদেশ বা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু জ্বরের আবির্ভাব বেশ পুরােনাে হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলােতে এর নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার এবং প্রচন্ডতা একে নতুন করে মনােযােগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, বিত্তশালী বা দরিদ্র কারােই যেন রেহাই নেই এই মরণঘাতি রােগ থেকে। সেজন্যই ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কিত আলােচনা আজ খুব বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

ডেঙ্গু জ্বরের ইতিহাস :

ডেঙ্গু জ্বরের ইতিহাস বেশ পুরােনাে। ২৬৫-৪২০ খ্রিস্টাব্দের চীনা মেডিক্যালএনসাইক্লোপিডিয়ায় উড়ন্ত পতঙ্গের সাথে সম্পর্কযুক্ত যে জলীয় বিষ’ এর কথা বলা হয় তা এই ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশাকেই নির্দেশ করে। তবে ডেঙ্গু মহামারির সবচেয়ে নির্ভরযােগ্য বিবরণ প্রথম পাওয়া যায় ১৭৭৯ ও ১৭৮০ সালে, যখনএশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকা এই মহামারির কবলে পড়ে।

এরপর ১৮২৮ সালের দিকে ডেঙ্গু শব্দটির প্রচলন শুরুহয়। ১৯০৬ সালে এডিস ইজিপ্টাই মশার পরিবাহিতা সম্পর্কে সবাই নিশ্চিত হয়। ১৯০৭ সালে ভাইরাসঘটিত রােগের মধ্যে ডেঙ্গু হয়ে উঠে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংক্রামক রােগ।

পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডেঙ্গুর লক্ষণীয় বিস্তার লক্ষ করা যায়। ১৯৭০ সালে আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এর ব্যাপক প্রাদুর্ভাবকে শিশু মৃত্যুর অন্যতমকারণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber
ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber

 

ডেঙ্গু জ্বরের প্রকারভেদ :

ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত দুধরনের হয়ে থাকে। যথা: ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর ও হেমােরেজিকডেঙ্গু জ্বর। হেমােরেজিক ডেঙ্গু জ্বরকে আবার চারটি ধাপে বর্ণনা করা হয়েছে- গ্রেড ওয়ান, গ্রেড টু, গ্রেড থ্রি ও গ্রেডফোর। ডেঙ্গু ভাইরাসের আবার চারটি সেরােটাইপ রয়েছে। এগুলাে হলো- DEN-1, DEN-2, DEN-3 এবং DEN-4।তবে DEN-2 এবং DEN-3 সবচেয়ে মারাত্মক সেরােটাইপ।

ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber
ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ:

এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী স্ত্রী মশা কোনাে ব্যক্তিকে কামড়ালে সেইব্যক্তি ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আবার আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনাে জীবাণুবিহীন মশা কামড়ালে,সে মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু বাহী মশায় পরিণত হয়। রােগীকে দংশনের দুই সপ্তাহ পর মশা সৎক্ৰমণক্ষম হয়ে উঠে এবংগােটা জীবনই সংক্রমণশীল থাকে। এভাবেই মশার মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনে এ রােগ ছড়িয়ে পড়ে।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ :

যেকোনাে ভাইরাস জনিত জ্বরের মতাে ডেঙ্গতেও জ্বরের সাথে মাথাব্যথা, কাশি, গলাব্যথা, গাব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য ও বমি ভাব থাকে। এছাড়াও হাড়ে ব্যথা অনুভূত হয়। এই জ্বরে মাথাব্যথার তীব্রতা চোখের পিছনে বেশিথাকে। চোখ ঘুরালে বা আই মুভমেন্টে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গতে উপযুক্ত সবগুলাে উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তবে হেমােরেজিক ডেঙ্গতে গ্রেড ওয়ানে কোনাে রক্তক্ষরণ হয় না। গ্রেড টুতে চোখ, নাক ও চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণহয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বমি ও পেট ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকে। গ্রেড থ্রি ও গ্রেড ফোরকে একত্রে শক সিনড্রোম বলে। গ্রেডথ্রিতে পালস বা নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ হয়ে আসে। গ্রেড ফোরে নাড়ির স্পন্দন ও রক্তচাপ কোনােটিই পাওয়া যায় না। শকসিনড্রোম হয়ে গেলে দেহের কোনাে অঙ্গে ঠিকমতাে রক্ত সরবরাহ না হওয়ায় অরগান ফেইল করে। একে বলে মান্টিঅরগান ফেইলর।

ডেঙ্গু জ্বরের বিভিন্ন পর্যায় :

ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত তিনটি পর্যায়ে অতিবাহিত হয়। প্রথমত, জ্বর চলাকালীন বাকেব্রাইল স্টেজ। এ সময় বিভিন্ন মাত্রায় তাপমাত্রা বাড়ে। সাধারণত ছয় দিনের মধ্যে জ্বর কমে যায়। জ্বরের পরেরসময়টাকে বলে এফেব্রাইল ফেজ বা জ্বর প্রবর্তী পর্যায়। এটিকে ক্রিটিক্যাল ফেজও বলে। কারণ, ডেঙ্কর জটিলতাগুলাে এসময়ই শুরু হয়। সিভিয়ার ডেঙ্গু এফেব্রাইল বা ক্রিটিক্যাল পিরিয়ডে, অর্থাৎ রােগের ষষ্ঠ, সপ্তম বা অষ্টম দিনে দেখা দেয়।

এর লক্ষণগুলাে হলাে দ্রুত রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তবমি, কালাে পায়খানা, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত ও ত্বকের নিচে রক্ত।জমা। এর সঙ্গে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, বুকে-পেটে পানি জমা ছাড়াও ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। রক্তচাপ কমে যাওয়ায় রােগী প্রলাপ বকে, অস্থির আচরণ করে। কখনাে কখনাে মানি অরগান ফেইল করে। রােগের তৃতীয়পর্যায়ে জ্বর থাকে না। কিন্তু প্রচণ্ড দুর্বলতা গ্রাস করতে পারে। একে বলে ক্রোনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম।

ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber
ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber

বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর :

বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গ রােগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এদেশের।চিকিৎসকদের কাছে অপরিচিত এ রােগটি সে বছর প্রায় শতাধিক লােকের প্রাণ কেড়ে নেয়। পরের বছরগুলােতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রােগীর সংখ্যা কমলেও ২০১৬ সালের পর আবার তা উল্লেখযােগ্য হারে বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে এ রােগে বাংলাদেশে বেশকিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ২০১৯ সালে এর তীব্রতা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়।

লক্ষাধিক মানুষ।আক্রান্ত হয়। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা প্রায় দেড়শত। সারা দেশে ডেঙ্গর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা গেলেও সর্বাধিক আক্রান্ত অঞ্চল ঢাকা বিভাগ। সরকার, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় ডেঙ্গ পরিস্থিতিসামলে উঠে।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা :

ডেঙ্গু জ্বরের সুনির্দিষ্ট কোনাে চিকিৎসা বা পেটেন্টকৃত কোনাে ওষুধ নেই। লক্ষণ বা উপসর্গদেখেই চিকিৎসা করতে হয়। ডেঙ্গু রােগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়ােজন রােগ সনাক্তকরণ। জ্বরের সময়, বিশেষকরে দ্বিতীয় দিন থেকে চতুর্থ দিনের মধ্যে রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গ এনএস-১ এন্টিজেন পজেটিভ হলে রােগ নিশ্চিতভাবেপ্রমাণিত হয়।

ক্লাসিক্যাল ও গ্রেড-১ হেমােরেজিক ডেঙ্গর ক্ষেত্রে বাড়িতেই চিকিৎসা সম্ভব। সাধারণত এ ধরনের রােগী ৫থেকে ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে রােগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রামে থাকতে হবে।যথেষ্ট পরিমাণ পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

খাবার গ্রহণ করতে না পারলেশিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে। জ্বর কমানাের জন্য শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। ব্যথা কমানাের জন্যএসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় কোনাে প্রকার ওষুধ খাওয়া যাবে না। গ্রেড-২, ৩ ও ৪ হেমােরেজিক ফিভারেররােগীকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। এ ধরনের রােগীকে ঠিকমতাে ফুইড দিতে পারাটাই মূল চিকিৎসা। রােগী।শকে চলে গেলে নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ লাগবে।

ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber
ডেঙ্গু জ্বর রচনা । Essay on Dengue fiber

ডেঙ্গু জ্বর রােধে করণীয় :

যেকোনাে রােগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরােধই উত্তম। ডেঙ্গ জ্বর প্রতিরােধের মূলমন্ত্রই হলাে-এডিস মশার বিস্তার রােধ করা। কোনােভাবেই যেন মশা কামড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করা। তাই ডেঙ্গ প্রতিরােধে প্রথম এবং প্রধান করণীয় হলাে মশার ডিম পাড়ার উপযােগী স্থানগুলাে পরিষ্কার রাখা, মশা নিধনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

টব,ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খােসা, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের চৌবাচ্চা ইত্যাদি স্থানে কোনাে ক্রমেই পানিজমতে দেওয়া যাবে না। ঘরে, বারান্দায় ও টয়লেটে কোনােক্রমেই পাঁচ দিনের বেশি পানি জমিয়ে রাখা যাবে না।একুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এডিস মশাসাধারণত সকাল-সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে দিনের অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবেকাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে। প্রয়ােজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও ঘরের জানালায় নেটব্যবহার করা যেতে পারে।

দিনে ঘুমালে অবশ্যই মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে। শিশুদের ফুলপ্যান্ট ও ফুলহাতার জামা গায়েস্কুলে পাঠাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে সর্বদা মশারির ভেতর রাখতে হবে। এছাড়াও মশা নিধনের জন্য স্প্রে, কয়েল,ম্যাট ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।

উপসংহার :

আমাদের অসচেতনতা এবং সুষ্ঠু ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে ডেঙ্গু জ্বর ভয়াবহ রূপপরিগ্রহ করেছে। এর মােকাবেলায় সর্বপ্রথম জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বিশেষজ্ঞগবেষকবৃন্দকে সম্পৃক্ত করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের উপায় এবং ডেঙ্গু জ্বরের প্রতিষেধক আবিষ্কারের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।সর্বোপরি, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহকে সততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে ডেঙ্গ মােকাবেলায় কাজ করতে হবে।তাহলেই মানুষ এ সর্বনাশা রােগ থেকে মুক্তি পাবে।

ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর

প্রশ্নঃ ডেঙ্গু জ্বরের কারণ হলো ?

উত্তরঃ Dengue virus

প্রশ্নঃ ডেঙ্গু জ্বর এর বাহক কোন মশা ?

উত্তরঃ এডিস মশা

প্রশ্নঃ কত সালে সর্বপ্রথম ডেঙ্গু জ্বরের বর্ণনা প্রকাশিত হয়?

উত্তরঃ ১৭৭৯ সালে

প্রশ্নঃ এডিস মশায় কামড়ের মাধ্যমে সংক্রমণের কতদিন পর ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলো দেখা দেয়?

উত্তরঃ সংক্রমণের পর তিন থেকে পনেরো দিনের মধ্যে

প্রশ্নঃ এডিস মশা কখন বংশ বিস্তার করে?

উত্তরঃ সাধারণত বর্ষা মৌসুমে।

প্রশ্নঃ এডিস মশাতে কোন ভাইরাস থাক?

উত্তরঃ এডিস ভাইরাস ।

আরও পড়ুনঃ

 

 

ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবার আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৮ টি ব্যবস্থা নিন:

 

ডেঙ্গু থেকে বাঁচার ৭ টি প্রাকৃতিক উপায়!

 

মন্তব্য করুন