তাহারেই পড়ে মনে – সুফিয়া কামাল

তাহারেই পড়ে মনে – তাহারেই পড়ে মনে কবিতাটি ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে কবিতাটি বেগম সুফিয়া কামালের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সাঁঝের মায়াতে অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

তাহারেই পড়ে মনে - সুফিয়া কামাল

 

বেগম সুফিয়া কামাল (২০ জুন ১৯১১ – ২০ নভেম্বর ১৯৯৯) বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ আব্দুল বারী এবং মাতার নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। তার বাবা কুমিল্লার বাসিন্দা ছিলেন।

যে সময়ে সুফিয়া কামালের জন্ম তখন বাঙালি মুসলিম নারীদের গৃহবন্দী জীবন কাটাতে হত। স্কুল-কলেজে পড়ার কোন সুযোগ তাদের ছিলো না। পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ একরকম নিষিদ্ধ ছিল। সেই বিরুদ্ধ পরিবেশে সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। তিনি পারিবারিক নানা উত্থানপতনের মধ্যে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন।

 

তাহারেই পড়ে মনে – সুফিয়া কামাল

 

“হে কবি! নীরব কেন-ফাল্গুন যে এসেছে ধরায়,
বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”
কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি-
“দখিন দুয়ার গেছে খুলি?
বাতাবী নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?
দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?”

“এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম “কেন কবি আজ
এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুষ্পসাজ?”
কহিল সে সুদূরে চাহিয়া-
“অলখের পাথার বাহিয়া
তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?
ডেকেছে কি সে আমারে? -শুনি নাই,রাখিনি সন্ধান।”

কহিলাম “ওগো কবি, রচিয়া লহ না আজও গীতি,
বসন্ত-বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি-এ মোর মিনতি।”
কহিল সে মৃদু মধুস্বরে-
“নাই হ’ল, না হোক এবারে-
আমার গাহিতে গান! বসন্তরে আনিতে ধরিয়া-
রহেনি,সে ভুলেনি তো, এসেছে তো ফাল্গুন স্মরিয়া।”

কহিলাম “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?
যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।”
কহিল সে পরম হেলায়-
“বৃথা কেন? ফাগুন বেলায়
ফুল কি ফোটে নি শাখে? পুষ্পারতি লভে নি কি ঋতুর রাজন?
মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নি সে অর্ঘ্য বিরচন?”

“হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?”
কহিলাম “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”
কহিল সে কাছে সরি আসি-
“কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে। তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোন মতে।”

 

সুফিয়া কামাল 3 তাহারেই পড়ে মনে - সুফিয়া কামাল

 

তাহারেই পড়ে মনে কবিতা সারমর্ম:

এ কবিতায় প্রকৃতি ও মানবমনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাৎপর্যময় অভিব্যক্তি পেয়েছে। সাধারণভাবে প্রকৃতির সৌন্দর্য মানব মনের অফুরন্ত আনন্দের উৎস। এ কবিতায় কবির ব্যক্তিজীবনের দুঃখময় ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে। তাঁর সাহিত্য সাধনার প্রধান সহায়ক ও উৎসাহদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের মৃত্যুতে (১৯৩২) কবির জীবনে শূন্যতা নেমে আসে। তাহারেই পড়ে মনে কবিতাকে আচ্ছন্ন করে আছে এই বিষাদময় রিক্ততার সুর। বসন্ত এলেও উদাসীন কবির অন্তর জুড়ে রিক্ত শীতের করুণ বিদায়ের বেদনা।

 

সুফিয়া কামাল 1 তাহারেই পড়ে মনে - সুফিয়া কামাল

 

তাহারেই পড়ে মনে কবিতার মূলভাবঃ

‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় কবি সুফিয়া কামালের ব্যক্তি জীবনের দুঃখময় ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে। স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুতে তার জীবনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা কবিমনকে আচ্ছন্ন করে রাখে রিক্ততার হাহাকারে। প্রকৃতিতে নব বসন্তের আগমনও কবি হৃদয়ের সেই বিষাদময় রিক্ততার সুরকে মুছে ফেলতে পারেনি। তাই বসন্ত এলেও উদাসীন কবির অন্তর জুড়ে থাকে রিক্ত শীতের করুণ বিদায়ের বেদনা। প্রকৃতির সঙ্গে মানব মনের সম্পর্ক নিবিড় ও আনন্দপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কবির শোকাচ্ছন্ন হৃদয়ে বসন্ত-প্রকৃতির প্রভাব কোনো ভাবেই সে সম্পর্ককে জাগিয়ে তুলতে পারেনি এবং কবির অন্তরকেও স্পর্শ করতে পারেনি। গঠনরীতির দিক থেকে নাটকীয় রসপূর্ণ এ কবিতার সংলাপনির্ভর কথোপকথন একে বিশেষ তাৎপর্যময় করে তুলেছে।

 

সুফিয়া কামাল তাহারেই পড়ে মনে - সুফিয়া কামাল

 

তাহারেই পড়ে মনে কবিতা আবৃত্তিঃ

 

 

আরও দেখুনঃ

 

 

মন্তব্য করুন