প্রবন্ধ রচনার বিস্তারিত জানুন

প্রবন্ধ রচনার বিস্তারিত: বিষয়ভিত্তিক চিন্তা ও যুক্তিনিষ্ঠ নাতিদীর্ঘ সুবিন্যস্ত গদ্য রচনাকে ‘প্রবন্ধ’ বলা হয়। কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে লেখকের যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য প্রকাশকারী গদ্য রচনাই সাধারণ অর্থে প্রবন্ধ হিসেবে বিবেচিত। ‘প্রবন্ধ’ শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘রচনা’, ‘নিবন্ধ’, ‘সন্দর্ভ’, ‘প্রস্তাব’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়। প্রবন্ধ রচনার মধ্যে লেখকের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। প্রত্যেক প্রবন্ধে কোনো না কোনো প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে।

প্রবন্ধ রচনার বিস্তারিত জানুন

যথার্থ তথ্য প্রমাণের সমাবেশে, ভাবে, ভাষায়, চিন্তার প্রয়োগে সেই প্রতিপাদ্য বিষয়কে রূপদান করাই প্রবন্ধের লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “রচনা বলিতে গেলে ভাবের সহিত ভাব প্রকাশের উপায় দু-ই সম্মিলিতভাবে বোঝায়; কিন্তু বিশেষ করিয়া উপায়টাই লেখকের।” প্রবন্ধের ভাষা ও দৈর্ঘ্যের পরিমাপ সম্পর্কে যথেষ্ট বৈচিত্র্য লক্ষ করা গেলেও সাধারণত প্রবন্ধের ভাষারীতি গদ্য এবং আকারের দিক থেকে বেশি বড়ও নয়, আবার বেশি ছোটও নয় এমন হতে হবে।

প্রবন্ধ রচনার বিস্তারিত জানুন:

প্রবন্ধের সংজ্ঞা:

প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে প্রকৃষ্ট বন্ধনযুক্ত রচনাকেই প্রবন্ধ বলা হতো। সেই অর্থে গদ্য-পদ্য-নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের প্রকৃষ্ট বন্ধনযুক্ত যে কোনো রচনাই প্রবন্ধ। প্রাচীন আলঙ্কারিকগণ ‘প্রবন্ধকে’ ‘মহাকাব্যের’ প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন (সাহিত্য দর্পণ)। এই ধারণা এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। আধুনিক বিচারে প্রবন্ধ, বিশেষ একশ্রেণীর গদ্য রচনা। একে উদ্দেশ্যমূলক রচনাও বলা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য, পাঠকের জ্ঞান-সীমা বৃদ্ধি এবং মানসিক কল্পলোকের সমৃদ্ধি সাধন। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য সম্পর্কে নানা মনীষী নানা মত ব্যক্ত করেছেন।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ : ভারতকোষ ৪র্থ খণ্ড (পৃ. ৪৪০)-এর মতে, “বাংলা প্রবন্ধ এক বিশেষ প্রকরণের গদ্য রচনা, যা লেখকের মননশীলতার কাঠামোর ওপর যুক্তি এবং রসের আয়তন প্রতিষ্ঠা করিয়া পাঠকের সম্মুখে তত্ত্ব ও তথ্যের বিচার করার দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয়।”

মুক্তধারা : বাংলা বিশ্বকোষ : ৩য় খণ্ড (পৃ. ২৫২)-এর মতে, “কোনো বিষয়ে লেখকের চিন্তা ও অনুভূতির যুক্তিপূর্ণ সংক্ষিপ্ত গদ্য রচনাই প্রবন্ধ ।”

ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত (পৃ. ৪৪৮)’ গ্রন্থে বলেন, “জ্ঞান বিজ্ঞান, দর্শন-ইতিহাস, সমাজ-রাজনীতি, সাহিত্য-শিল্পকলা—প্রভৃতি ব্যাপার নিয়ে যে সমস্ত তত্ত্বকেন্দ্রিক ও বস্তুগত চিন্তামূলক গদ্য নিবন্ধ রচিত হয় তাকে বলা যেতে পারে প্রবন্ধসাহিত্য।।

শ্রীশচন্দ্র দাশ ‘সাহিত্য সন্দর্শন (পৃ. ১৬৮)’ গ্রন্থে বলেছেন, “সাধারণত কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে আশ্রয় করিয়া লেখক কোনো বিষয়বস্তু সম্বন্ধে যে আত্মসচেতন নাতিদীর্ঘ সাহিত্যরূপ সৃষ্টি করেন, তাহাকেই প্রবন্ধ বলা হয়।”

Books প্রবন্ধ রচনার বিস্তারিত জানুন

প্রবন্ধের শ্রেণীবিভাগ

প্রবন্ধকে প্রধানত দু শ্রেণীতে ভাগ করা যায় : ক. বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ এবং খ. ব্যক্তিগত প্ৰবন্ধ।

ক. বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ :

বিষয়বস্তুর প্রাধান্য স্বীকার করে যেসব প্রবন্ধ রচিত হয়, সেগুলোকে বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ বলা হয় । এ ধরনের প্রবন্ধ কোনো সুনির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে আদি, মধ্য ও অন্ত সম্বলিত চিন্তাপ্রধান সৃষ্টি। এতে লেখকের পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানের পরিচয়ই প্রধানভাবে প্রকাশ পায়। লেখকের জ্ঞানের পরিধি বা অনন্যসাধারণ চিন্তাশীলতা এই শ্রেণীর প্রবন্ধে রূপায়িত হয়। বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধে লেখকের বিচারবুদ্ধি ও চিন্তাশীলতা প্রধান এই প্রবন্ধে লেখক নিজেকে পাঠকের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেন। বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধই সাধারণত প্রবন্ধ নামে পরিচিত। এই শ্রেণীর প্রবন্ধে থাকে বস্তু বা বিষয়ের পরিচয়, মত বিশেষের উপস্থাপনা ও আলোচনা, তথ্য ও তত্ত্বের আবিষ্কার, বিদ্যাবুদ্ধির প্রকাশ, চিন্তাশক্তির অভিব্যক্তি এবং যথাযোগ্য ভাষাজ্ঞান। এসব রচনায় সাহিত্যিক প্রতিভার চেয়ে তীক্ষ্ণ বোধশক্তিরই বেশি পরিচয় দিতে হয় । এই শ্রেণীর প্রবন্ধকে আরও কয়েকটি উপবিভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যথা

১. বিবৃতিমূলক প্রবন্ধ: কোনো কাহিনী বা ঘটনার বিবরণ বিস্তারিতভাবে রূপায়িত হয়ে ওঠে।

২. ব্যাখ্যামূলক প্রবন্ধ : কোনো বিশেষ মত অথবা তত্ত্ব আলোচনাই এই শ্রেণীর প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।

৩. বর্ণনামূলক প্রবন্ধ : কোনো স্থান, বস্তু বা ক্রিয়াকর্মাদির বর্ণনা প্রকাশ পায়। এতে বিষয়বস্তুর বর্ণনা যথাযথ, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও চিত্রধর্মী হয়ে থাকে।

৪. বিতর্কমূলক প্রবন্ধ : কোনো মতবাদের বিশ্লেষণ বা এর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন এ ধরনের প্রবন্ধের উপজীব্য।

৫. চিন্তামূলক প্রবন্ধ : বিশেষ দৃষ্টিতে কোনো বিষয়ের স্বরূপ নির্ণয় করা এর বৈশিষ্ট্য। ৬. তথ্যমূলক প্রবন্ধ : বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বিবিধ তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে এই ধরনের প্রবন্ধ রচিত হয়।

৭. নীতিকথার আলোচনামূলক প্রবন্ধ : এতে প্রচলিত নীতিকথার আলোচনা স্থান পায়

খ. ব্যক্তিগত প্রবন্ধ :

যেসব প্রবন্ধে লেখকের ব্যক্তি হৃদয়ই প্রধান হয়ে দেখা দেয়, সেগুলোকে ব্যক্তিগত প্রবন্ধ বলা হয়। এগুলো জ্ঞানের বিষয়কে লঘু কল্পনাপ্রদীপ্ত করে হাস্যোজ্জ্বলরূপে পাঠককে মুগ্ধ করে। ব্যক্তিগত প্রবন্ধ লেখকের অনুভূতি স্নিগ্ধ, সরল, হাস্যমধুর, আত্মস্পর্শ প্রধান। এই প্রবন্ধে লেখক পাঠকের সাথে অভিন্ন হয়ে একান্ত আপনজনের মতো আপনার কথাটি বলে যান।

Books 2 প্রবন্ধ রচনার বিস্তারিত জানুন

প্রবন্ধের কাঠামো

প্রবন্ধে সাধারণত তিনটি অংশ থাকে— ভূমিকা, মূল অংশ ও উপসংহার। এ ধরনের ভাগ এমন হতে হবে যেন ভূমিকা ও উপসংহার মূল রচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয় ভূমিকাকে সূচনা হিসেবে, মূল অংশকে মধ্যভাগ হিসেবে এবং উপসংহারকে রচনার শেষ অংশ হিসেবে মনে করা।

১. ভূমিকা :

ভূমিকা হচ্ছে প্রবন্ধের প্রারম্ভিক বা সূচনা অংশ। এই অংশ অনেকটা রচনার মূল বিষয়ে ঢোকার দরজার মতো। ভূমিকা হবে বিষয়ানুগ, আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী। তাতে যেন অপ্রাসঙ্গিক ও অনাবশ্যক বক্তব্য ভিড় না করে এবং তার অকারণ বিস্তৃতিও যেন না ঘটে।

২. মূল অংশ :

প্রবন্ধের মূল বিষয় বা বক্তব্য এই অংশে সন্নিবেশিত হয়। এই অংশে যেসব প্রসঙ্গ আলোচিত হয় তা পৃথক অনুচ্ছেদে বিন্যস্ত করতে হয়। প্রয়োজনে প্রতিটি অনুচ্ছেদের শুরুতে সংকেত (Hints) নির্দেশ করা যেতে পারে। সংকেত-সূত্রের ক্রমপরম্পরা রক্ষা করা দরকার। পরম্পরার ধরন অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভরশীল। যেমন— স্মৃতিকথার মতো ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে সময় বা কালগত পরম্পরা রক্ষা করতে হয়। ভ্রমণ বৃত্তান্তের মতো বিবরণধর্মী রচনায় ভৌগোলিক স্থানগত পরম্পরা রক্ষার প্রয়োজন পড়ে।

কোনো সমস্যা নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করতে গেলে সমস্যাগুলোকে শ্রেণীবদ্ধ করে একে একে সেগুলোর ওপর আলোকপাত করতে হয় এবং সেই সঙ্গে সমস্যার কারণ ও সমাধানের পথ নির্দেশ করারও প্রয়োজন পড়ে। চিন্তামূলক রচনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিষয় থেকে সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার রীতিতেও এক ধরনের পরম্পরা থাকে। মূল অংশ যেভাবেই বিন্যস্ত করা হোক না কেন প্রবন্ধ লেখার আগে তার একটা ছক তৈরি করে নেয়া ভালো।

৩. উপসংহার:

প্রবন্ধের ভাববস্তু বা বক্তব্য শুরু থেকে রচনার মধ্যাংশ পর্যন্ত যে ধারাবাহিকতা বা ক্রমপরম্পরা নিয়ে অগ্রসর হয় তা একটা ভাবব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে শেষ হয় উপসংহারে এসে। উপসংহারটিকে এমন হতে হবে যাতে প্রবন্ধের সমাপ্তির সাথে সাথে পাঠকের মনে প্রবন্ধের বক্তব্য সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা জন্মে। উপসংহার তাই বক্তব্যের সমাপ্তিসূচক ভাবপ্রধান হয়ে উঠলে তাকে সার্থক মনে হয়। এছাড়াও উপসংহারে লেখক ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশ করতে পারেন। সংকট উত্তরণের দিক-নির্দেশনার সারাৎসার ব্যক্ত করারও সুযোগ থাকে উপসংহারে। তাই ভূমিকা অংশের মতো উপসংহার অংশও রচনার সার্থকতার পক্ষে বিশেষ গুরুত্ববহ।

Competitive Exams Preparation Gurukul, GOLN Logo [ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি গুরুকুল, লোগো ]

প্রবন্ধের ভাষা ও রচনারীতি:

প্রবন্ধের ভাষা ও রচনারীতি প্রবন্ধ রচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রবন্ধের ভাষা সহজ ও সরল হবে। বক্তব্য যাতে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় সেরকম সহজ ভাষা ব্যবহার করতে হবে। সন্ধিযুক্ত বা সমাসবদ্ধ দুর্বোধ্য শব্দ, অপরিচিত বা অপ্রচলিত শব্দ, শ্রুতিমাধুর্যহীন শব্দ বা জটিল বাক্য এড়িয়ে চলতে হবে। অলঙ্কারের বাহুল্য ব্যবহার অবশ্যই বর্জনীয়। বিষয়বস্তুর তারতম্য অনুসারে প্রবন্ধের ভাষা ও ভঙ্গি নির্ধারণ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলে গুরুগম্ভীর এবং হালকা বিষয় হলে সে অনুসারে হালকা ঢঙের ভাষারীতির ব্যবহার করা দরকার।

প্রবন্ধের সর্বত্র একই ধরনের ভাষারীতি থাকবে অর্থাৎ সাধুরীতি আর চলিতরীতির মিশ্রণ দূষণীয়। আধুনিক বাংলায় যেহেতু চলিত রীতিরই জয়জয়কার সেজন্য চলিত রীতি অবলম্বন করে প্রবন্ধ লেখার চর্চা করা উচিত। বক্তব্যের স্পষ্টতর প্রকাশের জন্য উপযুক্ত উপমার ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা আছে। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে প্রখ্যাত লেখকের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে উদ্ধৃতির বাহুল্য অবশ্যই পরিহার করতে হবে। উপযুক্ত উপমা, প্রবাদ বাক্য, কবিতা বা গদ্যের অংশবিশেষ উদ্ধৃতি বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করতে সহায়তা করে। বানানের ভুলভ্রান্তি, নিরর্থক শব্দ প্রয়োগ প্রভৃতি পরিহার করে ভাষা নির্ভুল করতে হবে।

প্রবন্ধ রচনায় দক্ষতা অর্জনের উপায়:

প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে লেখক তার দৃষ্টিভঙ্গি মনের মাধুরী, ধ্বনি, গন্ধ, স্বাদ, রুচি ও পছন্দ ইত্যাদি যতটা পারেন ব্যবহার করেন এবং আমাদের সামনে তার বক্তব্য বিষয়কে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। লেখক যা বলতে চান তাকে অপরের কাছে গ্রহণযোগ্য তথা যৌক্তিক করে তুলতে তার থাকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। তাই নিয়মিত অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নিচে প্রবন্ধ রচনায় দক্ষতা অর্জনের কৌশলসমূহ আলোচনা করা হলো :

১. প্রবন্ধের বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যাবশ্যক। কেননা প্রবন্ধের বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলেই কেবল প্রবন্ধের মর্মবস্তু, যুক্তি, তথ্য, তত্ত্ব-বিচার-বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ানুগ, প্রাসঙ্গিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব। অপ্রাসঙ্গিক ও অনাবশ্যক বিস্তৃতি উৎকৃষ্ট প্রবন্ধের পরিপন্থি। তাই প্রবন্ধ রচনায় পরিমিতিবোধের পরিচয় দিতে হয়।

২. প্রবন্ধের বক্তব্য বাস্তব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এবং যৌক্তিক পরম্পরায় উপস্থাপিত ও সন্নিবেশিত হওয়া উচিত, যেন তা স্পষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে সহায়ক হয়। ৩. প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে ভাষার ওপর ব্যাপক দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। প্রবন্ধের ভাষা হতে হয় বিষয় ও ভাবের অনুগামী।

৪. প্রবন্ধের ভাষা হতে হয় সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল। নির্ভুল বাক্য গঠনের ওপরও প্রবন্ধের উৎকর্ষ নির্ভর করে। তাই প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে ভাষার অপপ্রয়োগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়।

৫. প্রবন্ধে অযথা ও অপ্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত কিংবা উদ্ধৃতি ব্যবহার করা উচিত নয়। ৬. প্রবন্ধে প্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশ করা ছাড়াও বক্তব্যকে গ্রহণীয় করার জন্য প্রবাদ-প্রবচন, উদ্ধৃতি কিংবা উদাহরণ প্রয়োগ করা চলে। তবে সুদীর্ঘ উদ্ধৃতি পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

৭. লেখকের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, চিন্তাশক্তি, পঠন-পাঠন, ভাষা-দক্ষতা, উপস্থাপনা-রীতি ইত্যাদির পার্থক্যের কারণে একজন শিক্ষার্থীর প্রবন্ধের সঙ্গে অন্যজনের প্রবন্ধ হুবহু মেলে না। এটিই বাস্তব। নিজের ভাষায় সুন্দরভাবে গুছিয়ে নির্ভুলভাবে লেখা হয়েছে কি-না, পরীক্ষক সেটিই দেখে থাকেন। প্রবন্ধ লেখার কোনো নির্দিষ্ট ছক-বাঁধা নিয়ম নেই, যা অনুসরণ করে সার্থক প্রবন্ধ তৈরি করা যায়।

৮. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ, সংবাদ, প্রতিবেদন, ফিচার ইত্যাদি নিয়মিত পাঠ করে নানা বিষয়ে বিষয়গত ধারণা অর্জন ও শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা যায়। এতে প্রবন্ধ লেখা সহজ হয়ে ওঠে। ধরা যাক ‘বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখতে বলা হলো। তখন হয়তো পরীক্ষার্থী এসব ভেবে ঘাবড়ে যাবে যে, বাংলাদেশে কবে প্রথম গ্যাস পাওয়া গেল, এখন কয়টা কূপ আছে, কোন কূপ কোথায় অবস্থিত, কোন কূপ থেকে কত গ্যাস দৈনিক উত্তোলন করা হচ্ছে, প্রতিদিন দেশে কি পরিমাণ গ্যাস জ্বালানো হয় ইত্যাদি তো স্পষ্ট স্মৃতিতে নেই ।

অতএব, এ বিষয়ে রচনা লেখা চলবে না। কিন্তু তা ঠিক নয়। এসব তথ্য উক্ত শিরোনামে একটা প্রবন্ধ লিখতে অবশ্যই সাহায্য করবে। কিন্তু যার এসব তথ্য মুখস্থ নেই, তিনিও এই বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে পারবেন যদি তার লেখার অভ্যাস থাকে। প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়ে পরীক্ষার্থী বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছে, তাই একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট।

প্রবন্ধ রচনায় দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রচুর প্রবন্ধ পড়তে হবে এবং কোন বিষয়ে, কি বক্তব্য, কিভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তা খুঁটিয়ে দেখতে হবে।

Essay writing, English essay, Essay writing format, Essay writing examples, Short essay writing, How to write an essay in English, Essay topics

পরীক্ষায় প্রবন্ধ রচনা:

প্রবন্ধ রচনা এক ধরনের সাহিত্যসৃষ্টি। কিন্তু পরীক্ষার হলে বা শ্রেণীকক্ষে সময়ের সীমাবদ্ধতার মধ্যে সেরকম প্রবন্ধ প্রত্যাশিত নয়। প্রবন্ধ চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যে কোনো বিষয়ে লেখার দক্ষতা বাড়বে, ভাষার ওপর দখল আসবে, নিজের অভিজ্ঞতা ও ধ্যান-ধারণা প্রকাশের ক্ষমতা অর্জন করবে এটাই আশা করা হয়। তবু একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে যতদূর সম্ভব সাহিত্যগুণসমৃদ্ধ প্রবন্ধ লেখাই কর্তব্য। সেজন্য প্রবন্ধ অনুশীলনের সময় যাতে তথ্যের যথাযথ সমাবেশ ঘটে এবং সাহিত্যরস সমৃদ্ধ প্রকাশভঙ্গি রূপ লাভ করে সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।

বিষয়ানুসারে প্রবন্ধের শ্রেণীবিভাগে বৈচিত্র্য আসে। সেসব বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ছাত্রছাত্রীদের ধারণা থাকতে হবে। সেজন্য তাদের কাজ হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের তথ্য সম্পর্কে নিজেকে অবহিত রাখা। সামগ্রিকভাবে প্রবন্ধ রচনা ও পরীক্ষা কেন্দ্রিক প্রবন্ধ রচনা এক কথা নয়। পরীক্ষায় প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সাফল্য লাভের জন্য নিম্নলিখিত দিক-নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে :

১. প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে মুখস্থ করার প্রবণতা পরিহার করে বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতার আলোকে নিজে নিজে লেখার সক্ষমতা অর্জনে সচেষ্ট হওয়া উচিত। তবে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই মানসম্পন্ন গ্রন্থের সহায়তায় বিচিত্র সব প্রবন্ধ পাঠ করে সুচারুভাবে উপস্থাপনায় দক্ষ হয়ে উঠতে হবে।

২. বরাদ্দ নম্বরের আলোকে ও সময়ের দিকে খেয়াল রেখে প্রবন্ধের দৈর্ঘ্য নির্ধারিত করতে হবে। অতি দীর্ঘ কিংবা নাতিদীর্ঘ কোনোটিই যেন অনুসৃত না হয় সেদিকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে।

৩. বিষয়ভিত্তিক তথ্য, তত্ত্ব ও উপাত্তের সর্বশেষ সংগ্রহ সমৃদ্ধ করতে হবে। শুধু বর্ণনায় প্রবন্ধ সমৃদ্ধ হয় না । তথ্য-তত্ত্ব ও উপাত্তের সন্নিবেশ প্রবন্ধকে মানসম্পন্ন করে।

৪. নিয়মিত লেখার মাধ্যমে হস্তাক্ষর সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, বানান নির্ভুল ও উপস্থাপনায় নিজস্বতা অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে।

৫. অনুভূতি ও সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ প্রবন্ধগুলো বিখ্যাত লেখকদের রচনাসম্ভার থেকেই গ্রহণ করতে হবে। সাহিত্য ও ওজোম্বিতা গুণসম্পন্ন রচনা সংগ্রহ করার জন্য লেখক নির্বাচন করার পাশাপাশি তাদের রচনা অবিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে আন্তরিক হতে হবে।

Essay writing, English essay, Essay writing format, Essay writing examples, Short essay writing, How to write an essay in English, Essay topics

বিসিএস পরীক্ষায় প্রবন্ধ রচনা

নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় (৪০ + ৪০) = ৮০ নম্বরের ২টি প্রবন্ধ লিখতে হবে। একটি সংকেতযুক্ত (With Hints) ও অপরটি সংকেতবিহীন (Without Hints)। সংকেভযুক্ত প্রবন্ধে প্রশ্নপত্রে কিছু নির্দিষ্ট সংকেত (Hints) উল্লেখ করা হয় এবং সেই সংকেত অনুযায়ী প্রবন্ধ লিখতে হয়। সংকেতবিহীনের ক্ষেত্রে শুধু প্রবন্ধের নাম উল্লেখ থাকে এবং পরীক্ষার্থী তার ইচ্ছেমতো সংকেত ব্যবহার করে বা না করে প্রবন্ধ রচনা করে।

বিসিএস পরীক্ষায় মানসম্পন্ন প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে :

সংকেতযুক্ত (With Hints)-এর ক্ষেত্রে

ক. প্রশ্নপত্রে প্রদত্ত প্রবন্ধগুলোর মধ্যে কোনটি সম্পর্কে আপনার অপেক্ষাকৃত গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞান রয়েছে;

খ. উক্ত প্রবন্ধের Hints গুলো সম্পর্কে আপনার পূর্ণ ধারণা রয়েছে কিনা,

গ. প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সর্বশেষ তথ্য আপনার জানা আছে কিনা;

ঘ. ভাষাগত ও বানানের বিষয়ে যত্নশীল হতে হবে এবং পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে এবং

ঙ. ভূমিকা, সম্প্রসারণ ও উপসংহার এমনভাবে টানবেন যেন পড়া শেষে মনে হয় কাজটা ভালোভাবে শেষ হয়েছে।

সংকেতবিহীন (Without Hints)-এর ক্ষেত্রে

ক. প্রশ্নপত্রে প্রদত্ত প্রবন্ধগুলোর মধ্যে যেটি সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত গভীর ও বিস্তৃত ধারণা রয়েছে সেটি লেখার জন্য নির্বাচন করতে হবে;

খ. সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কোন কোন দিক আপনার প্রবন্ধে আলোচনা করবেন তা মনে মনে নির্ধারণ করে নিতে হবে;

গ. বক্তব্যের ধারাবাহিকতা ও যুক্তি সম্পর্কে যত্নবান হতে হবে;

ঘ. অপেক্ষাকৃত সহজ ও সরল বাক্যে প্রবন্ধ রচনা করতে হবে যাতে পরীক্ষক সহজেই মূল বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং

ঙ. নির্ধারিত সময় ও রচনার আকারের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। প্রবন্ধ যেন খুব বড় বা খুব ছোট না হয়ে যায়।

পরিশেষে বলা যায়, মুখস্থ করে ভালো প্রবন্ধ লেখা কঠিন। এক্ষেত্রে নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং পত্র-পত্রিকাসহ বিভিন্ন বই, পুস্তক থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক ও বিস্তৃত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিবেদন এবং প্রবন্ধ এক নয়। রিপোর্ট হবে ভাগাবেগমুক্ত, বস্তুনিষ্ঠ। সেখানে লেখকের ব্যক্তিগত আবেগ বা মনোভাব প্রকাশের অবকাশ নেই। সেজন্য একই বস্তুর ওপর বিভিন্ন লেখকের রিপোর্ট একই ধরনের হবে। তবে ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্যের ফলে প্রবন্ধে তারতম্য হবে। মোট কথা, প্রবন্ধ লেখার জন্য বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা, ভাষার ওপর আধিপত্য এবং লেখকের মৌলিকত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন:

“প্রবন্ধ রচনার বিস্তারিত জানুন”-এ 6-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন