বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা – বিখ্যাত এই কবিতা এটি লিখেছেন “সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়”।

 

বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা - সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৫ — ১৫ নভেম্বর ২০২০) একজন ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র অভিনেতা। অভিনেতা হিসেবে তিনি কিংবদন্তি, তবে আবৃত্তি শিল্পী হিসেবেও তার নাম অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথেই উচ্চারিত হয়। তিনি কবি এবং অনুবাদকও। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ৩৪টি সিনেমার ভিতর ১৪টিতে অভিনয় করেছেন।সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমহার্স্ট স্ট্রীট সিটি কলেজে, সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রথম সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় অপুর সংসার ছবিতে অভিনয় করেন।

 

বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

 

বসন্ত নয়, আমার দরজায় প্রথম কড়া নেড়েছিলো অবহেলাভেবেছিলাম, অনেকগুলো বর্ষা শেষে শরতের উষ্ণতা মিশে এলো বুঝি বসন্ত!দরজা খুলে দেখি আমাকে ভালোবেসে এসেছে অবহেলামধ্য দুপুরের তির্যক রোদের মতোঅনেকটা নির্লজ্জভাবে আমাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলাআমি চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলামআমার দীনদশায় কারো করুণা বা আর্তিব পেখম ছড়িয়ে আছে কি নাছিলো নাবৃষ্টিহীন জনপদে খড়খড়ে রোদ যেমন দস্যুর মতো অদমনীয়তেমনি অবহেলাও আমাকে আগলে রেখেছিলো নির্মোহ নিঃসংকোচিত
আমি অবহেলাকে পেছনে ফেলে একবার ভোঁ-দৌড় দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলামতখন দেখি আমার সামনে কলহাস্যে দাঁড়িয়েছে উপেক্ষাউপেক্ষার সঙ্গেও একবার কানামাছি খেলে এগিয়ে গিয়েছিলাম তোমাদের কোলাহল মুখর আনন্দ সভায়কি মিলেছিলো?ঠোঁট উল্টানো ভৎসনা আর অভিশপ্ত অনূঢ়ার মতো এক তাল অবজ্ঞাতাও সয়ে গিয়েছিলো একটা সময়ধরেই নিয়েছিলাম আমার কোনো কালেই হবে না রাবেন্দ্রিক প্রেমতোমাদের জয়গানে করতালিতে নতজানু থেকেছিলো আমার চাপা আক্ষেপ লজ্জাবুঝে গিয়েছিলাম জীবনানন্দময় স্বপ্ন আমাকে ছোঁবে নাজয়নুলের রঙ নিয়ে কল্পনার বেসাতিহারানো দিনের গানের ঐন্দ্রালিক তন্ময়তাবা ফুল, পাখি, নদীর কাব্যালাপে কারা মশগুল হলো, এ নিয়ে কৌতূহল দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনো
এত কিছু নেই জেনেও নজরুলের মতো বিদ্রোহী হবো, সেই অমিত শক্তিও আমার ছিলো নামেনে নেয়ার বিনয়টুকু ছাড়া আসলে আমার কিছুই ছিলো নাশুধু ছিলো অবহেলা, উপেক্ষা আর অবজ্ঞা
হ্যাঁ, একবার তুমি বা তোমরা যেন দয়া করে বাঁকা চোখে তাকিয়েছিলে আমার দিকেতাচ্ছিল্য নয়, একটু মায়াই যেন ছিলোহতে পারে কাঁপা আবেগও মিশ্রিত ছিলো তোমার দৃষ্টিতেওইটুকুই আমার যা পাওয়াআমি ঝড়ে যাওয়া পাতা, তুমি ছিলে আকস্মিক দমকা হাওয়াতারপরও অবহেলার চাদর ছাড়িয়েউপেক্ষার দেয়াল ডিঙিয়েও অবজ্ঞার লাল দাগ মুছে জীবনের কোনো সীমারেখা ভাঙতে পারিনি আমিএ কথা জানে শুধু অন্তর্যামী
অনেক স্বপ্নপ্রবণ হয়ে একবার ভেবেছিলামএই অবহেলা তুষারপাতের মুখচ্ছবি, উপেক্ষা কাচের দেওয়াল, অবজ্ঞা কুচকুচে অন্ধকারএর কিছুই থাকবে না একটি বসন্তের ফুঁৎকারেএকটি ঝলমলে পোশাক গায়ে চড়িয়ে হাতের মুঠোয় বসন্ত নিয়ে অন্তত একটি সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল করে নেবোএমন ভাবাবেগও ছিলো আকাশের কার্নিশে লেপ্টে থাকা পেঁজা মেঘের মতোঐ মেঘ কখনো বৃষ্টি হয়ে নামেনিতোমার বা তোমাদের নাগরিক কোলাহল কখনো থামেনি
অর্ধেক জীবন ফেলে এসে দেখি অনেক কিছু বদলে গেছেসেকি!কোথায় হারালো কৈশোরের দিনলিপি বিপন্ন করা অবহেলাস্বপ্নকে অবদমনের স্বরলিপিতে আটকে ফেলা উপেক্ষাআর তারুণ্যকে ম্রিয়মাণ করে রাখার অবজ্ঞাওরা আমাকে চোখ রাঙাতে পারে না ঠিক, তবে এখনো পোড় খাওয়া দিন বড্ড রঙিন
আমি আজ সমুদ্র জলে হাত রেখে বলে দিতে পারিকোন ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তোমাদের গোপন অশ্রুকণাআকাশ পানে তাকিয়ে বুঝতে পারি কার দীর্ঘশ্বাসে ঝড়ে পড়ছে নক্ষত্রএমনকি তুমি যে সম্রাজ্ঞীর বেশের আড়ালের মিহিন কষ্ট চেপে হয়েছো লাবণ্যময় পাষাণ, পাথরএটাও দেখতে পাই অন্তরদৃষ্টি দিয়ে
আমি জানি, দীর্ঘশ্বাসে ভরা এ আখ্যান যদি পেতো কবিতার রূপসেই অবহেলা হতো বসন্ত স্বরুপ

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা - সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

 

বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা আবৃত্তি ঃ

 

 

Competitive Exams Preparation Gurukul, GOLN Logo [ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি গুরুকুল, লোগো ]

মন্তব্য করুন