মনসামঙ্গলের নীল দুঃখ | লাল নীল দীপাবলি | হুমায়ুন আজাদ | বাংলা প্রস্ততি

মনসামঙ্গলের নীল দুঃখ : চাঁদসদাগর আগে ছিলো স্বর্গে। স্বর্গে শোনা যায় সবাই সুখে থাকে, চাঁদসদাগরও ছিলো। কিন্তু কপালে তার সুখ সইলো না। একদিন অকারণে মনসা দেবী রেগে উঠলো চাঁদের ওপর, অভিশাপ দিলো স্বর্গচ্যুত হয়ে মর্ত্যে জন্ম নেয়ার। চাঁদ ছিলো গর্বী আত্মবিশ্বাসী পুরুষ। সেও ধমকে এলো মনসাকে; আমি যাচ্ছি পৃথিবীতে, কিন্তু আমি যদি সেখানে তোমার পুজো না করি তবে সেখানে কেউ তোমার পুজো করবে না। আরম্ভ হলো দুজনার বিরোধ, এ-বিরোধে চাঁদের জীবন হয়ে উঠলো বেদনায় নীল।

লখিন্দর ও বেহুলা - মনসামঙ্গলের নীল দুঃখ | লাল নীল দীপাবলি | হুমায়ুন আজাদ | বাংলা প্রস্ততি
লখিন্দর ও বেহুলা

চাঁদ মর্ত্যে এসে জন্ম নিলো। তার স্ত্রীর নাম হলো সনকা। চাঁদ পুজো করে শিবের আর গোপনে লুকিয়ে লুকিয়ে সনকা পুজো করে মনসার। চাঁদ একদিন দেখে ফেললো স্ত্রীর মনসাপুজো; রেগে লাথি দিয়ে ফেলে দিলো মনসার মঙ্গলঘট। মনসা খুব রাগী দেবী, চাঁদের ব্যবহারে জ্ব’লে উঠলো অগ্নিশিখার মতো।

[ মনসামঙ্গলের নীল দুঃখ | লাল নীল দীপাবলি | হুমায়ুন আজাদ | বাংলা প্রস্ততি ]

সে চাঁদসদাগরের ওপর প্রতিশোধ নিতে হলো বদ্ধপরিকর। চাঁদসদাগরের একটি বাড়ি ছিলো স্বর্গের উদ্যানের মতো সুন্দর; সেটি ধ্বংস করে দিলো মনসা। রাজ্যের দিকে দিকে দেখা দিলো সাপের অত্যাচার। মনসা হলো সাপের দেবী, সে তার সাপবাহিনীকে লাগিয়ে দিলো চাঁদের বিরুদ্ধে। চাঁদের এক বন্ধু একদিন সাপের কামড়ে মারা গেলো, চাঁদ বিমর্ষ হয়ে পড়লো। মানসার ক্রোধে আরো মৃত্যু দেখা দিলো চাঁদের বাড়িতে।

তার ছ-জন শিশুপুত্রকে মেরে ফেললো মনসা মনসা এসে হাজির হলো চাঁদের কাছে; বললো, আমার পুজো করো, আমি সব ফিরিয়ে দেবো। চাঁদ তবুও অটল, কিছুতেই সে পুজো করবে না মনসার। বরং সে মনসাকে আরো অপমান করলো, মনসাকে সে লাঠি নিয়ে তাড়া করলো, লাঠির আঘাতে ভেঙে গেলো মনসার কাঁকালি। সনকা এসে পায়ে পড়লো চাঁদ সদাগরের; বললো, তুমি মনসার পুজো করো, তাহলে আমি ফিরে পাবো আমার সন্তানদের। তবু চাঁদ অটল, সন্তান ও ধনের চেয়ে সম্মান তার কাছে বড়ো।

হুমায়ুন আজাদ, ১৯৪৭-২০০৪ [ Humayun Azad ]
হুমায়ুন আজাদ, ১৯৪৭-২০০৪ [ Humayun Azad ]
সনকার দুঃখ তার কোনো পুত্র নেই, যারা ছিলো তারা মরে গেছে। সে গোপনে মনসার স্তব ক’রে পুত্র মেগে নিলো। তবে মনসা বললো, এ-পুত্র বিয়ের রাত্রেই সাপের কামড়ে মারা যাবে। চাঁদসদাগর চোদ্দ ডিঙ্গা সাজিয়ে বের হলো বাণিজ্যে। তখন আবার এলো মনসা, তার পুজো করতে বললো। এবারও চাঁদ তাকে অপমান করে বিদায় দিলো। চাঁদ বিদেশে গিয়ে চোদ্দ ডিঙ্গা ভ’রে পণ্য কিনলো, যাত্রা করলো গৃহাভিমুখে।

তখন আবার মনসা এসে দাবি করলো পুজো। চাঁদ আগের মতো আবার তাকে অপমান করলো। তাই প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে পাগল হয়ে উঠলো মনসা, চাঁদের ওপরে প্রতিশোধ না নিলে তার জ্বালা জুড়োবে না। চাঁদের ডিঙ্গা আসছিলো সমুদ্রপথে, মনসার আদেশে হঠাৎ জেগে উঠলো সামুদ্রিক বাতাস, ক্ষেপে উঠলো বজ্রবিদ্যুৎ। চারদিকে উত্তাল ঝড়ের দোলা, বাতাসের তাণ্ডব। চাঁদের পণ্যভরা ডিঙ্গাগুলো একটির পর একটি ডুবে গেলো সমুদ্রের জলে। চাঁদ ভাসতে লাগলো সমুদ্রে।

এগিয়ে এলো মনসা, চাঁদকে সে মারতে চায় না, চায় চাঁদের পুজো। মনসা একটি আশ্রয় করার মতো বস্তু ভাসিয়ে দিলো চাঁদের দিকে। চাঁদ প্রায় সেটিকে ধরতে যাচ্ছিলো, এমন সময় তার মনে হলো এটি মনসার দান। তাই সে ওই আশ্রয় গ্রহণ করলো না। ভীষণ বলিষ্ঠ আত্মবিশ্বাসী পুরুষ চাঁদসদাগর। যাকে সে ঘৃণা করে তার দয়ায় বাঁচার ইচ্ছা নেই তার।

সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে এক সময় চাঁদসদাগর তীরে এসে পৌঁছোলো। নানা দুঃখে কেটে গেলো তার জীবনের বারোটি বছর। স্বদেশ স্বগৃহ থেকে দূরে কাটলো তার এ-সময়; তার ধন নেই, ডিঙ্গা নেই, গৃহ নেই। অভিজাত ধনী চাঁদসদাগর বারো বছর পরে ভিক্ষুকের মতো ফিরে এলো নিজ ঘরে। মনসার অত্যাচারের সে এক করুণ শিকার। তবু সে বিচলিত হওয়ার পাত্র নয়, কোনো অত্যাচারকে সে চরম ব’লে ভাবে না। সে ভেঙে পড়ে না। এমন অসাধারণ লোক চাঁদসদাগর।

মনসামঙ্গল কাব্যের দেবী মনসা [ Manasa ]
মনসামঙ্গল কাব্যের দেবী মনসা [ Manasa ]
দেশে ফিরে এসে দেখে সে যে-শিশুপুত্র রেখে গিয়েছিলো, সে পরিপূর্ণ যুবকে পরিণত হয়েছে। নাম তার লখিন্দর। একমাত্র পুত্রের মুখ দেখে সুখী বোধ করলো চাঁদ। চাঁদ অসীম। আশাবাদী, পরাজয়হীন তার চিত্ত। লখিন্দর সুন্দর যুবক। চাঁদ নিজের পুত্রের বিয়ের আয়োজন করতে লাগলো। সুন্দরী পাত্রী মিললো উজানিনগরে। মেয়ের নাম বেহুলা। বেহুলা নানা গুণে উজ্জ্বল মেয়ে। চাঁদ জানে বিয়ের রাতে বাসরঘরে সাপের কামড়ে লখিন্দরের মৃত্যু হবে। চাঁদ চায় এ-মৃত্যুকে ঠেকাতে।

সে ডেকে আনলো শিল্পীদের; তৈরি করতে বললো ছিদ্রহীন লোহার বাসর, যাতে কিছুতেই ঢুকতে না পারে সাপ। চাঁদ যেমন উদ্যমপরায়ণ, মনসাও তেমনি প্রতিহিংসাপরায়ণ। সে শিল্পীদের স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললো ছিদ্র রাখতে, নইলে তাদের ভাগ্যে আছে মৃত্যু। বিয়ে হয়ে গেলো লখিন্দর-বেহুলার বাসর রাতে ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ ক’রে বেহুলার দীর্ঘ কেশ বেয়ে শয্যায় উঠলো মনসার দ্রুত সাপ। কামড়ে দিলো। মৃত্যু হলো লখিন্দরের।

সাপের কামড়ে যারা মরে, তাদের ভাসিয়ে দেয়া হয় ভেলায় ক’রে নদীর জলে। অনেক রোদনের মধ্যে দিয়ে লখিন্দরকেও ভেলায় ক’রে ভাসিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হলো। বেহুলা এবার বেদনা থেকে উঠে বসলো, হলো পাথরের মতো শক্ত: বললো সেও যাবে ভেলায় ক’রে তার স্বামীর সাথে। সে ফিরিয়ে আনবে তার স্বামীকে স্বৰ্গলোক থেকে। বেহুলা সুন্দর, যেমন আনন্দে তেমনি বেদনায়, তেমনি প্রতিজ্ঞায়। কারো কথা সে মানলো না। স্বামীর সাথে সে উঠে বসলো ভেলায়।

নদীর নাম গাঙুর, ভেসে চলছে লখিন্দরের ভেলা, মৃত স্বামীর পাশে বসে আছে বেহুলা একরাশ বেদনার মতো। দিনে দিনে শরীর থেকে ঝ’রে যাচ্ছে লখিন্দরের মাংস আর নদীর স্রোতে ভেসে চলছে ভেলা। ভেলা ঘাট থেকে ঘাটে ভেসে যায়। বেহুলার সামনে আসে নানা বিপদ, কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বেহুলা সে সব জয় করে। তার মধ্যে আছে জয়ের বীজ, জয় তার ভাই।

যামিনী রায়ের আঁকা মনসা
যামিনী রায়ের আঁকা মনসা

ভাসতে ভাসতে ভেলা এসে পৌঁছোলো এক ঘাটে, যেখানে প্রতিদিন স্বর্গের ধোপানি কাপড় ধোয়। বেহুলা একদিন এক অবাক কাণ্ড দেখলো। ধোপানি কাপড় ধুতে এসেছে একটি ছোটো শিশু নিয়ে। শিশুটি দুরন্ত, সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে। ধোপানি এক সময় শিশুটিকে একটি আঘাত করে মেরে ফেললো। পরে যখন কাপড় কাচা হয়ে গেলো, তখন আবার সে তাকে বাঁচিয়ে নিয়ে চলে গেলো। বেহুলা বুঝতে পারলো, এ মানুষ বাঁচাতে জানে। পরদিন বেহুলা গিয়ে তার পদতলে পড়লো, তার স্বামীকে বাঁচিয়ে দিতে অনুরোধ করলো। ওই ধোপানির নাম নেতা। সে বললো, একে আমি বাঁচাতে পারবো না, কেননা একে মেরেছে মনসা। তুমি স্বর্গে যাও, দেবতাদের সামনে উপস্থিত হও। দেবতারা ভালোবাসে নাচ দেখতে। তুমি যদি তোমার নাচ দেখিয়ে তাদের মুগ্ধ করতে পারো, তাহলে তারা তোমার স্বামীকে বাঁচিয়ে দেবে।

আশার মোম জ্বলে উঠলো বেহুলার চোখে, মনে, সারা চেতনায়। সে স্বর্গে গেলো। দেবতারা ব’সে আছে; তাদের সামনে বেজে উঠলো বেহুলা, বেজে উঠলো তার পায়ের নূপুর। বেহুলার নাচে চঞ্চল হয়ে উঠলো চারদিক, তার নূপুরের ধ্বনিতে ভ’রে গেলো স্বর্গলোক। বেহুলার নৃত্যে এক অসাধারণ ছন্দ। মুগ্ধ হলো দেবতারা। তারা বেহুলাকে বর প্রার্থনা করতে বললো। সে তার স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা করলো। মহাদেব রাজি হলো তাতে। মনসা এসে বললো, আমি লখিন্দরকে ফিরিয়ে দিতে পারি, যদি চাঁদ আমার পুজো করে। বেহুলা তাতে রাজি হলো, এবং বললো, তাহলে তোমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে আমার শ্বশুরের সব কিছু। ফিরিয়ে দিতে হবে তাঁর পুত্রদের, তাঁর সমস্ত বাণিজ্যতরী। রাজি হলো মনসা।

সর্পদেবী মনসা [ Manasa ]
সর্পদেবী মনসা [ Manasa ]
মনসা সব ফিরিয়ে দিলো, বেঁচে উঠলো লখিন্দর, ভেসে উঠলো চোদ্দ ডিঙ্গা। চাঁদ পাগলের মতো ছুটে এলো বেহুলার কাছে। কিন্তু এসে যেই শুনলো যে তাকে মনসার পুজো করতে হবে, তখন তার সকল আনন্দ নিভে গেলো, সে দৌড়ে স’রে গেলো সবকিছুর থেকে। বেহুলা গিয়ে কেঁদে পড়লো চাঁদের পায়ে। যে-চাঁদ মনসাকে চিরদিন অপমান করেছে, যে কোনোদিন পরাজিত হতে চায় নি, সে-চাঁদ বেহুলার অশ্রুর কাছে পরাজিত হলো। বেহুলা বললো, তুমি শুধু বাঁ হাতে একটি ফুল দাও, তাহলেই খুশি হবে মনসা। চাঁদ বললো, আমি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বাঁ হাতে ফুল দেবো। তাই হলো। মুখ ফিরিয়ে বা হাতে একটি ফুল হেলাভরে ছুঁড়ে দিল চাঁদ। আর পৃথিবীতে প্রচারিত হলো মনসার পুজো।

আরও পড়ুন:

লাল নীল দীপাবলি | হুমায়ুন আজাদ | বাংলা প্রস্ততি

“মনসামঙ্গলের নীল দুঃখ | লাল নীল দীপাবলি | হুমায়ুন আজাদ | বাংলা প্রস্ততি”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন