শহীদ মিনার রচনা । Essay on Shahid Minar । প্রতিবেদন রচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর

শহীদ মিনার রচনা: একুশ মানে মাথা নত না করা, একুশ মানে স্বাধীনতার দাবিদার, বাঙালির চাওয়া বাংলা ভাষার অধিকার। তাই বাংলা ভাষার ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতিসত্তা ও জাতীয় ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল দিন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম মাইলফলক।

শহীদ মিনার রচনা

শহীদ মিনার রচনা । Essay on Shahid Minar
শহীদ মিনার রচনা । Essay on Shahid Minar

ভূমিকা :

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানাে একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি ‘

প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাতফেরির এ গান গেয়ে আমরা শহিদ মিনারে যাই। সেখানে ফুল দিয়ে ভাষাশহিদদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। শহিদ মিনার এদিন ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। আমাদের মনে করিয়ে দেয় মায়ের ভাষা আমাদের কাছে কত আপন। এ ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতেই বাংলার ছেলেরা রাজপথে প্রাণ দিয়েছিল। তাদের স্মৃতি রক্ষার্থেই নির্মিত হয়েছে শহিদ মিনার।

শহিদ মিনার সৃষ্টির পটভূমি :

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের ডাকা অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঘােষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এ ঘােষণার প্রতিবাদে ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ দিবস, ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালিত হয়। সেখান থেকে ঘােষণা দেওয়া হয় ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হবে।

এ ঘােষণার প্রেক্ষিতে শাষকগােষ্ঠী ২১ ফেব্রুয়ারিতে সকল প্রকার সভা, মিছিল, মিটিং ও শােভাযাত্রা নিষিদ্ধ করার জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ছাত্রজনতা এ বাধাকে অতিক্রম করে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে মিছিলটি আসতেই পুলিশ তার ওপর গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত, শফিউরসহ আরও অনেকে। তাদের স্মৃতি রক্ষার্থেই গড়ে ওঠে স্মৃতির শহিদ মিনার।

শহীদ মিনার রচনা । Essay on Shahid Minar
শহীদ মিনার রচনা । Essay on Shahid Minar

প্রথম শহিদ মিনার :

২১ ফেব্রুয়ারির শহিদদের স্মৃতি রক্ষার্থে ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছাত্রজনতা একটি শহিদ মিনার তৈরি করে। এ কাজে অংশ নেয় তিন শ ছাত্র ও দুজন রাজমিস্ত্রি । প্রথম শহিদ মিনার তৈরির জন্য সাইদ হায়দার একটি নকশা প্রণয়ন করেন। তাঁর নকশায় শহিদ মিনারের উচ্চতা নয় ফুট থাকলেও তৈরির পর এটির উচ্চতা হয় এগারাে ফুট।

শহিদ শফিউরের পিতা ২৪ ফেব্রুয়ারি এটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু কয়েক দিন পরই পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠী এ শহিদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। তবে বাঙালির হৃদয় থেকে তারা এ মিনারের স্মৃতি মুছে দিতে পারেনি।

কবি আলাউদ্দীন আল আজাদের ভাষায় :

ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক
একটি মিনার গড়েছি আমরা চার-কোটি পরিবার।

আজকের শহিদ মিনার :

বর্তমান শহিদ মিনারটির নকশা করেন স্থপতি হামিদুর রহমান। পরবর্তীকালে শহিদ মিনারটি আরও সংস্কার করা হয়। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে আমরা যে শহিদ মিনারটি ফর্মা-১৪, বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি-৭ম শ্রেণি দেখি সেটিই হামিদুর রহমানের চূড়ান্ত নকশার পরিপূর্ণ রূপ। প্রতিবছর মানুষ এ মিনারের সামনেই ভাষাশহিদদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। বর্তমানে এ শহিদ মিনারের আদলেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।

শহিদ মিনারের তাৎপর্য :

শহিদ মিনারের স্তম্ভগুলাে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার তথা মা ও তাঁর শহিদ সন্তানের প্রতীক। মাঝখানের সবচেয়ে উঁচু স্তম্ভটি মায়ের প্রতীক। চারপাশের ছােট চারটি স্তম্ভ সন্তানের প্রতীক, যারা তাদের বুকের রক্ত ঢেলে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। আমাদের জীবনে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু শুভ তার সঙ্গে শহিদ মিনারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

এটি শুধু একটি মিনার নয়, এটি আমাদের প্রেরণার প্রতীক। শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, মুক্তিযুদ্ধেও শহিদ মিনার আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। আমাদের যুদ্ধ জয়ের অন্যতম প্রেরণা একুশে ফেব্রুয়ারি। আমরা যখনই অন্যায়ের শিকার হই, তখনি শহিদ মিনার তার প্রতিবাদ করার জন্য আমাদের প্রেরণা জোগায়।

শহীদ মিনার রচনা । Essay on Shahid Minar
শহীদ মিনার রচনা । Essay on Shahid Minar

শহিদ মিনার ও আমাদের সংস্কৃতি :

আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শহিদ মিনারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দেশে যখনই কোনাে অন্যায় সংঘটিত হয়, তখনই শহিদ মিনারের সামনে থেকে তার প্রতিবাদ করা হয়। বিভিন্ন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান হয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে। এমনকি কোনাে জাতীয় বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর পর তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে রাখা হয়।

উপসংহার :

শহিদ মিনার আমাদের প্রেরণার উৎস। আমরা শহিদ মিনারের দিকে তাকিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ অতীতের কথা ভাবি। আর বর্তমান প্রজন্মের কাছে গর্ব করে সে কথাগুলাে বলি। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। ভাষার জন্য আমাদের আত্মদানের ইতিহাস ছড়িয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বাঙালির সঙ্গে সঙ্গে গােটা পৃথিবীর মানুষ আজ শহিদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষা শহিদদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

শহীদ মিনার সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন : ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানাে’ গানটির গীতিকার কে ?

উত্তর : আব্দুল গাফফার চৌধুরী।

প্রশ্ন : ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানাে’ গানটির সুরকার কে ?

উত্তর : আলতাফ মাহমুদ।

প্রশ্ন : ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানাে’ গানটির প্রথম সুরকার কে ?

উত্তর : আব্দুল লতিফ।

প্রশ্ন : ভাষা আন্দোলনভিত্তিক বিখ্যাত নাটকের নাম কি ?

উত্তর : কবর।

প্রশ্ন : ভাষা আন্দোলনভিত্তিক বিখ্যাত নাটক ‘কবর’ এর নাট্যকার কে ?

উত্তর : মুনীর চৌধুরী।

প্রশ্ন : ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ অধিবেশন ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় কবে ?

উত্তর : ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯।

প্রশ্ন : কবে থেকে আন্তর্জাতিকভাবে মাতৃভাষা দিবস উদযাপন শুরু করা হয় ?

উত্তর : ২১ ফেব্রুয়ারি,২০০০।

প্রশ্ন : বর্তমান শহীদ মিনারের স্থপতি কে ?

উত্তর : হামিদুর রহমান।

প্রশ্ন : শহীদ মিনারের মূল বেদির উপর অর্ধ-বৃত্তাকারে সাজানাে ৫টি স্তম্ভের প্রতীকী অর্থ কি ?

উত্তর : মা তার শহীদ সন্তানদের সাথে দাঁড়িয়ে আছেন।

প্রশ্ন : ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন কে ?

উত্তর : ভাষা শহীদ আবুল বরকতের মা হাসনা বেগম।

প্রশ্ন : পাকস্তানি বাহিনী শহীদ মিনার ধ্বংস করে কবে ?

উত্তর : ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়।

প্রশ্ন : সরকার পুনরায় শহীদ মিনার নির্মাণ করেন কবে ?

উত্তর : ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে।

প্রশ্ন : দেশের বাইরে প্রথম শহীদ মিনার নির্মান করা হয় কত সালে ?

উত্তর : ১৯৯৭ সালে, যুক্তরাজ্যের ওল্ডহ্যামে।

প্রশ্ন : লন্ডনে শহীদ মিনার নির্মান করা হয় কত সালে ?

উত্তর : ১৯৯৯ সালে।

প্রশ্ন : টোকিওতে শহীদ মিনার নির্মান করা হয় কত সালে ?

উত্তর : ২০০৫ সালে।

প্রশ্ন : আসামের শিলচর রেল স্টেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানানাে হয় কবে ?

উত্তর : ১৯ মে, ১৯৬১।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডের বাইরে বাংলাকে আধা-সরকারি ভাষার মর্যাদা দেয়া হয় কোথায় ?

উত্তর : আসামের বাঙালি অধ্যুষিত ৩টি জেলাতে।

প্রশ্ন : বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা করা হয়েছে কোথায় ?

উত্তর : সিয়েরালিয়নে।

প্রশ্ন : সর্বপ্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়

উত্তর : তমদ্দুন মজলিশ।

আরও পড়ুনঃ

“শহীদ মিনার রচনা । Essay on Shahid Minar । প্রতিবেদন রচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন