হুলিয়া কবিতা – নির্মলেন্দু গুন

হুলিয়া কবিতা – হুলিয়া নির্মলেন্দু গুণের লেখা একটি বিখ্যাত বাংলা ভাষার বাংলাদেশী কবিতা। এটি তার কাব্যগ্রন্থ প্রেমাংশুর রক্ত চাই-এ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কবি এটা লিখেছিলেন বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য। এতে ৮০টি ছন্দবদ্ধ ছত্র রয়েছে। কবিতাটিতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে।

 

নির্মলেন্দু গুন 3 হুলিয়া কবিতা - নির্মলেন্দু গুন

 

নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী (জন্ম ২১ জুন ১৯৪৫, ৭ আষাঢ় ১৩৫২ বঙ্গাব্দ), যিনি নির্মলেন্দু গুণ নামে ব্যাপক পরিচিত, একজন বাংলাদেশী কবি। কবিতার পাশাপাশি তিনি গদ্য এবং ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন ও ছবি এঁকেছেন। তার কবিতায় মূলত নারীপ্রেম, শ্রেণি-সংগ্রাম এবং স্বৈরাচার বিরোধিতা, এ-বিষয়সমূহ প্রকাশ পেয়েছে।

১৯৭০ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রেমাংশুর রক্ত চাই প্রকাশিত হবার পর জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এ-গ্রন্থের অন্তর্ভূত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা হুলিয়া কবিতাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পরবর্তীতে এর উপর ভিত্তি করে তানভীর মোকাম্মেল একটি পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়াও তার স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো কবিতাটি বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্য।

তাকে ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়।

 

হুলিয়া কবিতা – নির্মলেন্দু গুন

আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
চতুর্দিকে চিক্চিক করছে রোদ্দুর-’
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে।

কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহাকুমা স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল, একজন পেছন থেকে
কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে উঠেছিল; -আমি সবাইকে
মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন রাজনৈতিক নেতা
তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর থেকে
বারবার চেয়ে দেখলেন-, কিন্তু চিনতে পারলেন না।
বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনল না।

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি।
সে একই ভাঙাপথ, একই কালোমাটির আল ধরে
গ্রামে ফেরা, আমি কতদিন পর গ্রামে ফিরছি।

আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিক্চিক করছে রোদ,
শোঁ-শোঁ করছে হাওয়া।
অনেক বদলে গেছে বাড়িটি,
টিনের চাল থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল;
চিহ্নমাত্র শৈশবের স্মৃতি যেন নেই কোনোখানে।

পড়ার ঘরের বারান্দায় নুয়ে-পড়া বেলিফুলের গাছ থেকে
একটি লাউডুগী উত্তপ্ত দুপুরকে তার লক্লকে জিভ দেখালো।
স্বতঃস্ফূর্ত মুখের দাড়ির মতো বাড়িটির চর্তুদিকে ঘাস, জঙ্গল,
গর্ত, আগাছার গাঢ় বন গড়ে উঠেছে অনায়াসে; যেন সবখানেই
সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে এখানে শাসন করছে গোঁয়ার প্রকৃতি।
একটি শেয়াল একটি কুকুরের পাশে শুয়েছিল প্রায়,
আমাকে দেখেই পালাল একজন, গন্ধ শুঁকে নিয়ে
আমাকে চিনতে চেষ্টা করল-যেমন পুলিশ-সমেত চেকার
তেজগাঁয় আমাকে চিনতে চেষ্টা করেছিল।
হাঁটতে-হাঁটতে একটি গাছ দেখে থমকে দাঁড়ালাম,
অশোক গাছ, বাষট্টির ঝড়ে ভেঙে-যাওয়া অশোক,
একসময় কী ভীষণ ছায়া দিত এই গাছটা;
অনায়াসে দু’জন মানুষ মিশে থাকতে পারত এর ছায়ায়।
আমরা ভালোবাসার নামে একদিন সারারাত
এ-গাছের ছায়ায় লুকিয়েছিলুম।
সেই বাসন্তী, আহা সেই বাসন্তী এখন বিহারে,
ডাকাত স্বামীর ঘরে চার-সন্তানের জননী হয়েছে।

পুকুরের জলে শব্দ উঠল মাছের, আবার জিভ দেখাল সাপ,
শান্ত-স্থির বোকা গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে
একটি এরোপ্লেন তখন উড়ে গেলো পশ্চিমে…।
আমি বাড়ির পেছন থেকে শব্দ করে দরজায় টোকা দিয়ে
ডাকলুম-‘মা’।
বহুদিন যে-দরোজা খোলেনি,
বহুদিন যে-দরোজায় কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না,
মরচে-পরা সেই দরোজা মুহূর্তেই ক্যাচ্ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেল।
বহুদিন চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা-বিভাগ আমাকে ধরতে পারেনি,
চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি
কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দি হয়ে গেলুম;
সেই আমি কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ রেখে
একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম।

মা আমাকে ক্রন্দনসিক্ত একটি চুম্বনের মধ্যে
লুকিয়ে রেখে অনেক জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে
পুকুরের জলে চাল ধুতে গেলেন; আমি ঘরের ভিতরে তাকালুম,
দেখলুম দু’ঘরের মাঝামাঝি যেখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি ছিল,
সেখানে লেনিন, বাবার জমা-খরচের পাশে কার্ল মার্কস;
আলমিরার একটি ভাঙা-কাচের অভাব পূরণ করছে
স্ক্রুপস্কায়ার ছেঁড়া ছবি।

মা পুকুর থেকে ফিরছেন, সন্ধ্যায় মহাকুমা শহর থেকে
ফিরবেন বাবা, তাঁর পিঠে সংসারের ব্যাগ ঝুলবে তেমনি।
সেনবাড়ি থেকে খবর পেয়ে বৌদি আসবেন,
পুনর্বার বিয়ে করতে অনুরোধ করবেন আমাকে।
খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী ইয়াসিন,
তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য।
রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস।
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর:
-আমাদের ভবিষ্যত কী?
-আইয়ুব খান এখন কোথায়?
-শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?
-আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে?

আমি কিছুই বলব না।
আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে
বাঙলার বিভিন্ন ভবিষ্যৎকে চেয়ে চেয়ে দেখব।
উৎকন্ঠিত চোখে চোখে নামবে কালো অন্ধকার, আমি চিৎকার করে
কণ্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে বলব;
‘আমি এ সবের কিছুই জানি না,
আমি এ সবের কিছুই জানি না।’

 

হুলিয়া কবিতা - নির্মলেন্দু গুন
হুলিয়া কবিতা – নির্মলেন্দু গুন

হুলিয়া কবিতা পটভূমিঃ

হুলিয়া কবিতাটি প্রেমাংশুর রক্ত চাই পদ্য সংকলনের অন্তর্গত। নির্মলেন্দু গুণ কবিতাটি লেখার সময় আবুল হাসানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকতেন। কবিতাটি লেখার পরদিন গুণ খুঁজে পায়নি। হোস্টেলের কক্ষ থেকে বের হয়ে তিনি যখন ছিন্নভিন্ন অবস্থায় দেখতে পেলেন, তখন তিনি আবুল হাসানের কাছে গিয়ে কবিতার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় তিনি কবিতাটিকে অপমান করে গল্পটির সাথে তুলনা করেন এবং কবিতাটি পুনরায় লিখতে বলেন। পুনরায় লিখে নির্মলেন্দু আবুল হাসানকে কবিতাটি পড়ে শোনানোর পর তিনি তার কথা ফিরিয়ে নেন।

নির্মলেন্দু গুণ তখন কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারে কবিতাটি আবার লেখেন। কবিতার বইটি নির্মলেন্দু গুণ প্রকাশের জন্য বেশ কয়েকজন প্রকাশকের কাছে আবেদন করে ব্যর্থ হোন। এরপর ১৯৭০ সালের ২১ জুলাই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি কবিতাটি আবৃত্তি করেন। অনুষ্ঠানে সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি তার পত্রিকার একটি জনপ্রিয় কলামে কবিতাটির নাম উল্লেখ করেন। খান ব্রাদার্সের মালিক মোসলেম খান গুণকে কবিতার বই প্রকাশ করতে অনুপ্রাণিত করেন। কবিতাটি সহ বইটি পরে আলেকজান্দ্রা স্টিম মেশিন প্রেস প্রকাশ করে।

 

হুলিয়া কবিতা আবৃত্তিঃ

 

https://youtu.be/vC6wth87jmA

 

আরও দেখুনঃ

Competitive Exams Preparation Gurukul, GOLN Logo [ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি গুরুকুল, লোগো ]

মন্তব্য করুন