১৮ বছর বয়স কবিতা – সুকান্ত ভট্টাচার্য

১৮ বছর বয়স কবিতা – ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। উপরের চার চরণ মাত্রা বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, এর প্রতি পংক্তির মাত্রাসংখ্যা ৬ + ৬ + ২। ‘অহরহ’ শব্দ দুটিতে মূখ্য খণ্ডন হয়েছে। কবিতার আবৃত্তির গতি মধ্যম বা বিলম্বিত লয়ের।

 

১৮ বছর বয়স কবিতা - সুকান্ত ভট্টাচার্য

 

পিতা-নিবারণ ভট্টাচার্য, মা-সুনীতি দেবী। । ১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট তিনি তার মাতামহের বাড়ি কলকাতার কালীঘাটের ৪৩,মহিম হালদার স্ট্রীটের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম।উনার পৈতৃক বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অন্তর্গত ঊনশিয়া গ্রামে। বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। এ সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু।

সুকান্ত সমগ্রতে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলির বেশিরভাগই অরুণাচল বসুকে লেখা। অরুণাচল বসুর মাতা কবি সরলা বসু সুকান্তকে পুত্রস্নেহে দেখতেন। কবির জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়ীতে। সেই বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে। নিকটেই কবির ভাইদের মধ্যে দুজন, বিভাস ভট্টাচার্য ও অমিয় ভট্টাচার্যের বাড়ী। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুকান্তের সম্পর্কিত ভ্রাতুষ্পুত্র।

 

১৮ বছর বয়স কবিতা – সুকান্ত ভট্টাচার্য

 

আঠারো বছর বয়স কবিতা - সুকান্ত ভট্টাচার্য
আঠারো বছর বয়স কবিতা – সুকান্ত ভট্টাচার্য

 

আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।

আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়-
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।

এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।

আঠরো বছর বয়স ভয়ঙ্কর
তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর
এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।

আঠারো বছর বয়স যে দুর্বার
পথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার
ক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।

আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে
অবিশ্র্রান্ত; একে একে হয় জড়ো,
এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।

তব আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।

এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়-
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।।

 

১৮ বছর বয়স কবিতা বিশ্লেষণঃ

আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ এবয়স মানবজীবনের এক উত্তরণকালীন পর্যায়। কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করে মানুষ এ বয়সে। অন্যদের ওপর নির্ভরশীলতা পরিহার করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিতে হয় তাকে। এসময় থেকে তাকে এক কঠিন ও দুঃসহ অবস্থায় পড়তে হয়। স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি অন্যের উপর নির্ভরশীলতা পরিহার করে মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে চলার ঝুঁকি এ বয়সেই মানুষ নিয়ে থাকে। বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি নানা দুঃসাহসী স্বপ্ন, কল্পনা ও উদ্যোগ এ বয়সের তরুণদের মনকে ঘিরে ধরে। আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা যৌবনে পদার্পণ করে এ বয়সে মানুষ আত্মপ্রত্যয়ী হয়।

জীবনের মুখোমুখি দাঁড়ায় স্বাধীনভাবে। শৈশব – কৈশোরের পরনির্ভরতার দিনগুলোতে যে কান্না ছিল বয়সের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য তাকে সচেতভাবে মুছে ফেলতে উদ্যোগী হয়। এ বয়স জানে রক্তদানের পূণ্য দেশ, জাতি ও মানবতার জন্য যুগ যুগে এ বয়সের মানুষই এগিয়ে গেছে সবচেয়ে বেশি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছে সমস্ত বিপদ মোকাবেলায়। প্রাণ দিয়েছে অজানাকে জানবার জন্য, দেশ ও জনগণের মুক্তি ও কল্যাণের সংগ্রামে। তাই এ বয়স সুন্দর, শুভ ও কল্যাণের জন্য রক্তমূল্য দিতে জানে। সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে তারুণ্য স্বপ্ন দেখে নতুন জীবনের, নব নব অগ্রগতি সাধনের।

তাই সেইসব স্বপ্ন বাস্তবায়নে, নিত্য-নতুন করণীয় সম্পাদনের জন্য নব নব শপথে বলীয়ান হয়ে তরুণ-প্রাণ এগিয়ে যায় দৃঢ় পদক্ষেপে। তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা চারপাশের অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, পীড়ন, সামাজিক বৈষম্য ও ভেদাভেদ ইত্যাদি দেখে প্রাণবন্ত তরুণেরা ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর অনুভূতির তীব্রতা ও সুগভীর সংবেদশীলনতা এ বয়সেই মানুষের জীবনে বিশেষ তীব্র হয়ে দেখা দেয় এবং মনোজগতে তার প্রতিক্রিয়া ও হয় গভীর। এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা ভাল-মন্দ, ইতিবাচক-নেতিবাচক নানা তত্ত¡, মতবাদ, ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে এই বয়সের তরুণেরা।

দূর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার জীবনের এই সন্ধিক্ষনে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানা জটিলতাকে অতিক্রম করতে হয়। এই সময় সচেতন ও সচেষ্টভাবে নিজেকে পরিচালনা করতে না পারলে পদস্খলন হতে পারে। জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

সুকান্ত ভট্টাচার্য 2 ১৮ বছর বয়স কবিতা - সুকান্ত ভট্টাচার্য

 

১৮ বছর বয়স কবিতা আবৃত্তিঃ

 

 

আরও দেখুনঃ

Competitive Exams Preparation Gurukul, GOLN Logo [ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি গুরুকুল, লোগো ]

“১৮ বছর বয়স কবিতা – সুকান্ত ভট্টাচার্য”-এ 4-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন